মহাকাশের স্টার্টআপ
একসময় মহাকাশ অভিযান ছিল কেবল পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কাজ। রকেট বা মহাকাশযান তৈরি করতে লাগত হাজার হাজার প্রকৌশলী, বিপুল সরকারি বাজেট এবং বছরের পর বছর প্রস্তুতি।
সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
এখন বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠান। কেউ রকেট বানাচ্ছে, কেউ চাঁদে ল্যান্ডার পাঠাচ্ছে, কেউ মহাকাশে কারখানা তৈরির চেষ্টা করছে। আবার কেউ ছুটছে গ্রহাণুর দিকে।
মহাকাশ এখন আর শুধু নাসা, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির মতো সরকারি সংস্থা কিংবা স্পেসএক্স, লকহিড মার্টিনের মতো বড় কোম্পানির জগৎ নয়। ছোট ছোট বহু স্টার্টআপ কোম্পানিও এখন মহাকাশ প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে কাজ করছে।
নতুন যুগ
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ছোট স্যাটেলাইট, উন্নত ইলেকট্রনিকস, থ্রিডি প্রিন্টিং, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট এবং তুলনামূলক কম খরচের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা।
ফলে আগে যে কাজ কেবল বড় সরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলো করতে পারত, এখন ছোট প্রতিষ্ঠানও তাতে নামতে পারছে।
তবে বেসরকারি বিনিয়োগের বড় অংশই যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। ফলে নতুন মহাকাশ স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ছোট রকেট
এই নতুন শিল্পের পরিচিত উদাহরণ রকেট ল্যাব। নিউজিল্যান্ডে ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লং বিচে।
ছোট স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে ইলেকট্রন রকেট। এখন তারা আরও বড় নিউট্রন রকেট তৈরি করছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ও মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশও নিজেরাই তৈরি করছে।
অর্থাৎ শুধু রকেট নয়, ধীরে ধীরে পুরো মহাকাশ অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকেও এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
চাঁদের পথে
আরেক দল কোম্পানির লক্ষ্য চাঁদ।
টেক্সাসের হিউস্টনভিত্তিক ইনটুই티브 মেশিনস ২০২৪ সালে তাদের নোভা-সি শ্রেণির ওডিসিয়াস ল্যান্ডার চাঁদে নামায়। অ্যাপোলো-১৭-এর পর এটিই ছিল কোনো মার্কিন মহাকাশযানের প্রথম চন্দ্র অবতরণ। একই সঙ্গে এটি ছিল কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি মহাকাশযানের প্রথম সফট লুনার ল্যান্ডিং। তবে অবতরণের পর ল্যান্ডারটি কাত হয়ে পড়ে, ফলে এর কার্যক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়।
এরপর ২০২৫ সালে টেক্সাসের সিডার পার্ক ভিত্তিক ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস-এর ব্লু ঘোস্ট ল্যান্ডার সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করে। ল্যান্ডারটির সঙ্গে ছিল নাসার ১০টি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত যন্ত্র।
পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গভিত্তিক অ্যাস্ট্রোবোটিক-এর মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও চন্দ্রযান নিয়ে কাজ করছে।
এ ক্ষেত্রে নাসার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নাসা এখন প্রতিটি চন্দ্রযান নিজে তৈরি না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ও অন্যান্য পেলোড চাঁদে পৌঁছে দেওয়ার সেবা কিনছে।
মহাকাশ কারখানা
ক্যালিফোর্নিয়ার ভার্ডা স্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ এগোচ্ছে ভিন্ন পথে। তাদের লক্ষ্য মহাকাশের অতি ক্ষুদ্র মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশ কাজে লাগিয়ে ওষুধ ও বিশেষ ধরনের পদার্থ তৈরি করা। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের কারণে কিছু ধরনের ক্রিস্টাল বা পদার্থ তৈরি করা কঠিন। মহাকাশে সেই পরিবেশ ভিন্ন।
ভার্ডার মহাকাশযান কক্ষপথে উৎপাদনের কাজ করে। পরে তৈরি পদার্থ ক্যাপসুলে করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায়। অর্থাৎ মহাকাশযান এখানে শুধু গবেষণাগার নয়, ছোট একটি কারখানাও।
মহাকাশ ট্যাক্সি
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ইমপালস স্পেস কাজ করছে আরেকটি সমস্যা নিয়ে।
রকেট স্যাটেলাইটকে মহাকাশে পৌঁছে দিলেই সব সময় কাজ শেষ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটটিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথ অথবা আরও দূরের গন্তব্যে নিয়ে যেতে হয়।
ইমপালস স্পেস এমন মহাকাশযান তৈরি করছে, যেটা মহাকাশে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্যাটেলাইট ও অন্যান্য পেলোড বহন করতে পারে। অনেকটা মহাকাশের ট্যাক্সির মতো।
মহাকাশ স্টেশন
আরও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার ভাস্ট-এর। তারা বেসরকারি মহাকাশ স্টেশন তৈরি করছে। তাদের প্রথম স্টেশন হ্যাভেন-১ উৎক্ষেপণের লক্ষ্য এখন ২০২৭ সাল।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের যুগ শেষ হলে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে গবেষণা, নভোচারী প্রশিক্ষণ ও বাণিজ্যিক কাজের জন্য বেসরকারি স্টেশনের বাজার তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মহাকাশ স্টেশনও সরকারি স্থাপনা থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক অবকাঠামোয় পরিণত হতে পারে।
গ্রহাণুর খনি
এই নতুন মহাকাশ অর্থনীতির সবচেয়ে দুঃসাহসী ধারণাগুলোর একটি নিয়ে কাজ করছে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাস্ট্রোফোর্জ।
তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য গ্রহাণু থেকে প্লাটিনাম-গ্রুপের মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করা।
কাজটি এখনো বাস্তব খনন থেকে অনেক দূরে। প্রথমে প্রমাণ করতে হবে, তুলনামূলক ছোট একটি বাণিজ্যিক মহাকাশযান পৃথিবী থেকে বহু দূরের একটি ধাতব গ্রহাণুর কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছাতে এবং সেখানে কাজ করতে পারে।
সেই লক্ষ্যেই তৈরি হচ্ছে তাদের ডিপস্পেস-২ মহাকাশযান। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে এটি উৎক্ষেপণ করা হবে। মহাকাশযানটির লক্ষ্য পৃথিবীর কাছাকাছি একটি গ্রহাণুর কাছে পৌঁছে সেটিকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা এবং সেখানে অবতরণের চেষ্টা করা।
অ্যাস্ট্রোফোর্জ এর আগে ওডিন নামে একটি মহাকাশযান গভীর মহাকাশে পাঠিয়েছিল। ২০২৫ সালে উৎক্ষেপিত ওডিন প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেও পরিকল্পিত গ্রহাণু পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
এবার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে ডিপস্পেস-২-এ। কারণ মহাকাশে খনি তৈরির স্বপ্ন বাস্তব করতে হলে প্রথমে সেখানে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছানো শিখতে হবে।
নাসার ভূমিকা
বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের উত্থান মানে নাসার গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়। বরং বদলে যাচ্ছে তার ভূমিকা। আগে নাসা নিজেই মহাকাশযান তৈরি ও পরিচালনার প্রায় প্রতিটি ধাপে জড়িত থাকত। এখন অনেক ক্ষেত্রে তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা কিনছে।
চাঁদে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র পাঠাতে নাসার কমার্শিয়াল লুনার পেলোড সার্ভিসেস কর্মসূচিতে একাধিক মার্কিন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
ধারণাটি অনেকটা এমন – নাসা বলছে, আমাদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রটি চাঁদে পৌঁছে দাও। মহাকাশযান কীভাবে বানাবে এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছাবে, সেই দায়িত্ব অনেকটাই কোম্পানির।
এই ব্যবস্থাই ছোট ছোট মহাকাশ কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বাজার তৈরি করেছে।
দৌড়ে অস্ট্রেলিয়াও আছে
এই নতুন মহাকাশ অর্থনীতিতে অস্ট্রেলিয়াও খুব পিছিয়ে নেই। দেশটিতে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠান। কেউ রকেট বানাচ্ছে, কেউ মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছে, আবার কেউ পৃথিবী ও চাঁদে খনিজ অনুসন্ধানের প্রযুক্তি তৈরি করছে।
কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্টভিত্তিক গিলমোর স্পেস টেকনোলজিস তৈরি করছে অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব অরবিটাল রকেট এরিস। গোল্ড কোস্টে রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। উত্তর কুইন্সল্যান্ডের বোয়েনে গড়ে তুলেছে নিজস্ব অরবিটাল স্পেসপোর্ট।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেখান থেকে এরিস রকেটের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। রকেটটি ব্যর্থ হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে দেশটিতে তৈরি রকেট কক্ষপথে পাঠানোর প্রচেষ্টায় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।
স্পাইরাল ব্লু
সিডনিভিত্তিক স্পাইরাল ব্লু মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহারের প্রযুক্তি তৈরি করছে।
স্পাইরাল ব্লুর স্পেস এজ কম্পিউটার স্যাটেলাইটে সংগৃহীত তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর আগেই মহাকাশে বিশ্লেষণ করতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো ডেটার পরিমাণ কমানো সম্ভব।
প্রতিষ্ঠানটি এখন মহাকাশভিত্তিক লাইডার প্রযুক্তিও তৈরি করছে। লেজার ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁত ত্রিমাত্রিক ভূ-তথ্য সংগ্রহ করাই এর লক্ষ্য।
খনিজের সন্ধান
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডভিত্তিক ফ্লিট স্পেস টেকনোলজিস খনিজ অনুসন্ধানে মহাকাশ প্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে।
তাদের এক্সোস্ফিয়ার প্রযুক্তি স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ভূকম্পন সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একসঙ্গে ব্যবহার করে মাটির নিচের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরিতে সাহায্য করে।
একই ধরনের প্রযুক্তি পৃথিবীর বাইরেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
অর্থাৎ পৃথিবীর খনিজ অনুসন্ধানের প্রযুক্তিই একদিন চাঁদ অথবা অন্য গ্রহের সম্পদ অনুসন্ধানের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
গিলমোর, স্পাইরাল ব্লু ও ফ্লিট স্পেস – এই তিনটি প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার নতুন মহাকাশ শিল্পের তিনটি ভিন্ন দিক তুলে ধরছে।
ঝুঁকিও আছে
তবে মহাকাশ ব্যবসা এত সহজ নয়।
একটি রকেট ব্যর্থ হলেই কয়েক বছরের কাজ বড় ধাক্কা খেতে পারে। ছোট একটি যোগাযোগ ত্রুটিও কোটি কোটি ডলারের মহাকাশযানকে অকেজো করে দিতে পারে। অ্যাস্ট্রোফোর্জের ওডিন মিশন তারই একটি উদাহরণ।
সব মহাকাশ স্টার্টআপ শেষ পর্যন্ত টিকবেও না। প্রযুক্তি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। তাদের প্রমাণ করতে হবে, মহাকাশে তারা যে কাজ করছে তার জন্য সত্যিই একটি টেকসই বাজার রয়েছে।
নতুন সীমান্ত
তারপরও পরিবর্তনটি স্পষ্ট। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ৩২৫টি অরবিটাল উৎক্ষেপণ হয়েছে। এর প্রায় ৮৭ শতাংশই পরিচালনা করেছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ওই বছর কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে ৪,৫৪৪টি মহাকাশযান। এর প্রায় ৯৮ শতাংশের ভর ছিল ১,২০০ কিলোগ্রামের কম। অর্থাৎ মহাকাশযান শুধু বেসরকারি হচ্ছে না, ছোটও হচ্ছে।
একসময় সমুদ্রপথে নতুন বাণিজ্যপথ গড়ে তুলেছিল বেসরকারি জাহাজ কোম্পানিগুলো। পরে রেলপথ ও বিমান চলাচলেও বেসরকারি উদ্যোগ বড় ভূমিকা নিয়েছে।
মহাকাশেও সম্ভবত আমরা এখন তেমনই একটি পরিবর্তনের শুরুর দিকটা দেখছি। একসময় মহাকাশ ছিল মূলত রাষ্ট্রের অভিযান। এখন সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে নতুন এক বাণিজ্যিক অর্থনীতি।
