মূল কন্টেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › প্রকৃতি ও পরিবেশ › মেসির নামে নতুন ফুল: সালভিয়া মেসিয়াই

মেসির নামে নতুন ফুল: সালভিয়া মেসিয়াই

১৯ অক্টোবর, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১৪ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
English
মেসির নামে নতুন ফুল: সালভিয়া মেসিয়াই

ফুটবলের মাঠ ছাড়িয়ে এবার উদ্ভিদজগতেও নাম লেখালেন লিওনেল মেসি। সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় বিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন মেসির নামে ফুল—নতুন এক প্রজাতির গুল্মজাতীয় ফুলগাছ, যার বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে Salvia messii।

গাছটির ফুলের রং অনেকটা আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার মতো—হালকা আকাশি আর সাদা। ঠিক যেন মেসির গায়ে জড়ানো আর্জেন্টিনার সেই বিখ্যাত জার্সি!

পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৪০০ মিটার উচ্চতায় এই গাছ জন্মায়। এটি এক ধরনের সুগন্ধি গুল্ম, যা লম্বায় প্রায় দেড় মিটার পর্যন্ত হতে পারে। উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুযায়ী, এটি ল্যামিয়েসি (Lamiaceae) বা পুদিনা পরিবারের সদস্য। ফলে আমাদের অতি পরিচিত পুদিনা, তুলসী আর রোজমেরিও এই গাছের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

নতুন এই প্রজাতির বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক উদ্ভিদবিজ্ঞান সাময়িকী Phytotaxa-তে। পেরু ও আর্জেন্টিনার একদল উদ্ভিদবিজ্ঞানী যৌথভাবে প্রজাতিটির সন্ধান পান ও এর নামকরণ করেন।

গাছের নামকরণ কীভাবে হয়?

উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নামকরণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি রয়েছে। একে বলা হয় বাইনোমিয়াল নোমেনক্লেচার (Binomial Nomenclature) বা দ্বিপদ নামকরণ পদ্ধতি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রখ্যাত সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস এই পদ্ধতির সূচনা ও সুপ্রতিষ্ঠা করেন।

এই নিয়মে প্রতিটি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নামের দুটি অংশ থাকে। প্রথমটি গণ বা জিনাসের নাম এবং দ্বিতীয়টি স্পিসিস বা প্রজাতিকে সুনির্দিষ্টভাবে চেনার বিশেষ নাম।

যেমন, Salvia হলো এর জিনাস বা গণের নাম, আর স্পিসিসের নাম messii রাখা হয়েছে আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির সম্মানে।

এখানে একটি মজার ভাষাতাত্ত্বিক বিষয় রয়েছে। মেসির নামের ইংরেজি বানান ‘Messi’, তাহলে প্রজাতির নাম ‘messi’-র বদলে ‘messii’ হলো কেন? শেষে বাড়তি একটি ‘i’ এলো কোত্থেকে?

বোটানিক্যাল নামকরণের আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির সম্মানে প্রজাতির নামকরণ করার সময় নামটি লাতিন ব্যাকরণ অনুযায়ী রূপান্তর করতে হয়। কোনো পুরুষের নামের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি বা স্বরধ্বনি থাকলে লাতিন ষষ্ঠী বিভক্তি (genitive case) হিসেবে ‘-i’ যোগ করা হয়। যেহেতু ‘Messi’ নামের শেষে আগে থেকেই একটি ‘i’ রয়েছে, তাই লাতিন রীতি অনুযায়ী আরও একটি ‘i’ যুক্ত হয়ে তা হয়েছে messii।

তবে চাইলেই কেউ ইচ্ছেমতো নতুন উদ্ভিদের নাম দিতে পারেন না। গবেষকদের আগে অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে দেখাতে হয় যে গাছটি সত্যিই পূর্বে আবিষ্কার হওয়া সব প্রজাতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এরপর আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী মেনে প্রামাণ্য নমুনা (type specimen) ভেষজাগারে সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রকাশ করতে হয়।

বিপন্ন এক ফুল

মেসির বিশ্বজোড়া খ্যাতির সঙ্গে নাম যুক্ত হলেও এই নতুন উদ্ভিদটির ভবিষ্যৎ কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত নয়। এখন পর্যন্ত পেরুর মাত্র ছয়টি নির্দিষ্ট এলাকায় এর অস্তিত্বের সন্ধান মিলেছে।

বনভূমির দাবানল, সড়ক নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী খরার ফলে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল মারাত্মক হুমকির মুখে। এ কারণে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN)-এর মানদণ্ড অনুসারে গবেষকরা প্রজাতিটিকে ইতোমধ্যে বিপন্ন (Endangered) হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসির নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবার সেই নাম খোদাই হলো উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাতাতেও। তবে এই আবিষ্কার একই সঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক জরুরি বার্তা—পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের বিশাল একটি অংশ এখনো আমাদের অজানা। নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখাও সমান জরুরি।

তথ্যসূত্র

  1. Gonzáles, P., Uría, R., & Capcha-Ramos, J. (2026). A remarkable new Salvia (Lamiaceae) from the ecotonal vegetation surrounding the western Andean relict forests of Peru. Phytotaxa, 777(3), 272–282.
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।