মূল কন্টেন্টে যান
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › জীবনের বিজ্ঞান › এক কোষের রহস্য: সিঙ্গেল সেল সিকোয়েন্সিং

এক কোষের রহস্য: সিঙ্গেল সেল সিকোয়েন্সিং

২১ অক্টোবর, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৬ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
এক কোষের রহস্য: সিঙ্গেল সেল সিকোয়েন্সিং

আমাদের শরীরে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ রয়েছে। এদের অধিকাংশের ডিএনএ প্রায় একই রকম। অথচ সব কোষের কাজ এক নয়। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ যে কাজ করে, যকৃতের কোষ সেটা করে না। আবার রক্তের শ্বেতকণিকার কাজও সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু একই ডিএনএ থাকা সত্ত্বেও কোষগুলোর মধ্যে এত পার্থক্য কেন?

এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে জিনের কার্যকলাপে। সব কোষে সব জিন একসঙ্গে সক্রিয় থাকে না। কোনো কোষে কিছু জিন সক্রিয় থাকে, অন্য কোষে সক্রিয় থাকে অন্য জিন।

একেকটি কোষের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও জিনের কার্যকলাপ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন এক অসাধারণ প্রযুক্তি। এর নাম, সিঙ্গেল সেল সিকোয়েন্সিং (Single-cell Sequencing)।

কোষের ভেতরের খবর

আগে বিজ্ঞানীরা কোনো টিস্যুর হাজার হাজার কোষ একসঙ্গে নিয়ে তাদের জিনের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করতেন। এতে সামগ্রিক একটা ধারণা পাওয়া যেত। কিন্তু প্রতিটি কোষে আলাদাভাবে কী ঘটছে, সেটা বোঝা কঠিন ছিল। সিঙ্গেল সেল সিকোয়েন্সিং সেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি কোষের ডিএনএ কিংবা আরএনএ বিশ্লেষণ করা যায়। সিঙ্গেল সেল ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের সাহায্যে কোষটির জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব।

অন্যদিকে, সিঙ্গেল সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে জানা যায়, কোষটির কোন জিনগুলো সক্রিয় রয়েছে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে টিস্যু থেকে কোষগুলো আলাদা করা হয়। তারপর প্রতিটি কোষের আরএনএ সংগ্রহ করে বিশেষ বারকোড যুক্ত করা হয়। এরপর সিকোয়েন্সিং ও কম্পিউটার বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায়, কোন কোষে কোন জিন থেকে কতটা আরএনএ তৈরি হচ্ছে। এ থেকে জিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অর্থাৎ হাজার হাজার কোষের ভিড়েও প্রতিটি কোষের আলাদা বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

ক্যানসার গবেষণায় বিপ্লব

ধরা যাক, একজন রোগীর টিউমার থেকে দশ হাজার কোষ সংগ্রহ করা হলো। তারপর দেখা গেল, সব ক্যানসার কোষ এক রকম নয়। কিছু কোষ দ্রুত বিভাজিত হচ্ছে। কিছু কোষে এমন সব জিন সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো ওষুধ প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার টিউমারের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষ। আগে এসব পার্থক্যের অনেক কিছুই সামগ্রিক বিশ্লেষণে আড়ালে থেকে যেত।

এখন বিজ্ঞানীরা কোষগুলোর এই বৈচিত্র্য বুঝতে পারছেন। ফলে ক্যানসার কীভাবে বৃদ্ধি পায় এবং চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সেটা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

উদ্ভিদ প্রজননেও নতুন দিগন্ত

এই প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানেই নয়, উদ্ভিদ প্রজনন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একটি ধানগাছ লবণাক্ত মাটিতে জন্মাচ্ছে। তার শিকড়ের সব কোষ কিন্তু লবণাক্ততার প্রতি একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সিঙ্গেল সেল প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, শিকড়ের কোন ধরনের কোষে কোন জিন সক্রিয় হচ্ছে। এই তথ্য ভবিষ্যতে লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজে লাগতে পারে।

তবে উদ্ভিদকোষের শক্ত কোষপ্রাচীরের কারণে অক্ষত কোষ আলাদা করা কঠিন। তাই অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কোষের পরিবর্তে কোষের নিউক্লিয়াস বিশ্লেষণ করা হয়। এই পদ্ধতির নাম, সিঙ্গেল নিউক্লিয়াস আরএনএ সিকোয়েন্সিং।

আরও এক ধাপ এগিয়ে

বিজ্ঞানীরা এখন আরও একটি চমকপ্রদ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। এর নাম স্পেশিয়াল ট্রান্সক্রিপ্টোমিক্স (Spatial Transcriptomics)।

সিঙ্গেল সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিং জানায়, কোন কোষে কোন জিন সক্রিয়। আর স্পেশিয়াল ট্রান্সক্রিপ্টোমিক্স জানাতে পারে, টিস্যুর কোথায় সেই জিনের কার্যকলাপ ঘটছে।

দুটি প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিজ্ঞানীরা এখন শুধু কোষের পরিচয়ই নয়, তার অবস্থান এবং আশপাশের কোষগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য পারস্পরিক সম্পর্কও অনুসন্ধান করতে পারছেন।

একসময় জীববিজ্ঞানীরা একটি টিস্যুকে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করতেন। এখন তাঁরা সেই টিস্যুর হাজার হাজার কোষের প্রতিটির ভেতরে আলাদাভাবে উঁকি দিতে পারছেন। জীববিজ্ঞানের গবেষণা এখন চলে এসেছে একেবারে একক কোষের স্তরে। আর সেখানেই উন্মোচিত হচ্ছে জীবনের নতুন সব রহস্য।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।