অস্কার ক্লাইন: অদেখা মাত্রার দিশারী
মহাবিশ্বে এমন কোনো দিক আছে, যেটা আমরা দেখতে পাই না? দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার বাইরে আরও একটি মাত্রা? সেটি যদি এত ক্ষুদ্র পরিসরে গুটিয়ে থাকে যে সেটা আমাদের চোখেই পড়ে না?
প্রায় একশ বছর আগে এমনই এক আশ্চর্য ধারণাকে গাণিতিক রূপ দিয়েছিলেন সুইডিশ পদার্থবিজ্ঞানী অস্কার ক্লাইন। মহাকর্ষ আর তড়িৎচুম্বকত্বকে এক সূত্রে বাঁধতে গিয়ে তিনি খুঁজেছিলেন আমাদের পরিচিত জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অতিরিক্ত মাত্রা।
কৌতূহল থেকে কোয়ান্টাম
অস্কার বেঞ্জামিন ক্লাইনের জন্ম ১৮৯৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সুইডেনে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল আগ্রহ। মায়ের ছোট দূরবিন দিয়ে আকাশ দেখতেন। কিশোর বয়সেই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সভান্তে আরহেনিয়ুসের গবেষণাগারে কাজ শেখার সুযোগ পান।
১৯১৮ সালে যান কোপেনহেগেনে। সেখানে নিলস বোর ও হেনড্রিক ক্রামার্সের সংস্পর্শে তাঁর সামনে খুলে যায় কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নতুন জগৎ। পরবর্তী সময়ে ক্লাইন হয়ে ওঠেন বোরের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন।
পঞ্চম মাত্রা?
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতায় স্থানের তিন মাত্রা ও সময় মিলিয়ে স্থানকাল চার মাত্রার। জার্মান বিজ্ঞানী থিওডর কালুৎসা এর সঙ্গে স্থানের আরেকটি মাত্রা যোগ করে মহাকর্ষ ও তড়িৎচুম্বকত্বকে একই গাণিতিক কাঠামোয় আনার চেষ্টা করেছিলেন।
ক্লাইন ধারণাটিকে এগিয়ে নেন। ১৯২৬ সালে তিনি প্রস্তাব করেন, অতিরিক্ত মাত্রাটি অতি ক্ষুদ্র একটি বৃত্তের মতো গুটিয়ে থাকতে পারে। তাই বড় পরিসরে সেটি আমাদের কাছে ধরা পড়ে না।
ব্যাপারটি বুঝতে একটি সরু তারের কথা ধরা যায়। দূর থেকে সেটিকে শুধু লম্বা একটি রেখা মনে হয়। কিন্তু খুব কাছে গেলে দেখা যায়, তার চারপাশ ঘুরেও চলা সম্ভব। দূর থেকে সেই বাড়তি দিকটি বোঝা যায়নি। ক্লাইনের অতিরিক্ত মাত্রাটি অবশ্য সাধারণ তারের চারপাশের দিক নয়। এটি ধারণাটি বোঝানোর জন্য একটি উপমা।
তাঁর এই প্রচেষ্টা পরিচিত হয় কালুৎসা-ক্লাইন তত্ত্ব নামে। এটি প্রকৃতির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হয়ে ওঠেনি। তবে ক্ষুদ্র পরিসরে গুটিয়ে থাকা অতিরিক্ত মাত্রার ধারণাটি পরবর্তী পর্যায়ে স্ট্রিং থিওরিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। তবে অতিরিক্ত মাত্রার অস্তিত্ব এখনও পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কোয়ান্টামের সঙ্গে আপেক্ষিকতা
ক্লাইনের আরেক বিখ্যাত অবদান ক্লাইন-গর্ডন সমীকরণ। কোয়ান্টাম তত্ত্ব ক্ষুদ্র কণাদের আচরণ ব্যাখ্যা করে। কিন্তু কণার গতি আলোর গতির কাছাকাছি হলে বিশেষ আপেক্ষিকতার নিয়মও মানতে হয়। এই দুই প্রয়োজনকে মেলানোর শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা ছিল এই সমীকরণ।
১৯২৬ সালে ক্লাইন এবং ওয়াল্টার গর্ডন স্বাধীনভাবে এর বিকাশে অবদান রাখেন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে এটি বিশেষ করে শূন্য স্পিনের কণা ও ক্ষেত্রের বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ। স্পিন হলো কণার একটি নিজস্ব কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য; একে সাধারণ লাটিমের ঘূর্ণন মনে করলে ভুল হবে।
আলো–ইলেকট্রনের সংঘর্ষ
আলোর কণা ফোটন কোনো ইলেকট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষে দিক ও শক্তি দুটোই বদলাতে পারে। এই ঘটনাকে বলে কম্পটন বিক্ষেপণ।
জাপানি পদার্থবিজ্ঞানী ইয়োশিও নিশিনার সঙ্গে ক্লাইন এই বিক্ষেপণের হিসেব করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তৈরি করেন। ১৯২৮ সালে তাঁরা ডিরাকের আপেক্ষিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করে কাজটি করেন।
ক্লাইন-নিশিনা সূত্র বলে দেয়, একটি ফোটন ইলেকট্রনে ধাক্কা খেয়ে কোন দিকে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কত। আলো ও পদার্থের পারস্পরিক ক্রিয়া বোঝার ইতিহাসে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
বাধার ওপারেও পথ
ক্লাইনের নাম জড়িয়ে আছে আরেক বিস্ময়কর বিষয়ের সঙ্গে। এর নাম, ক্লাইন প্যারাডক্স।
সাধারণ অভিজ্ঞতা বলে, বাধা যত উঁচু হবে, সেটা পেরোনো তত কঠিন হবে। কিন্তু আপেক্ষিক কোয়ান্টাম জগতের হিসেবে ক্লাইন দেখলেন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে খুব শক্তিশালী বাধাও কণাকে প্রত্যাশামতো আটকে দিতে পারে না।
এটি সাধারণ কোনো দেয়াল ভেদ করার গল্প নয়। এখানে বাধা বলতে বোঝানো হচ্ছে কণার ওপর বল প্রয়োগকারী একটি শক্তিক্ষেত্র। সেই ক্ষেত্রে কণার অদ্ভুত আচরণ বোঝার জন্য সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে হয়। এই সমস্যাটি আপেক্ষিক কোয়ান্টাম তত্ত্বের গভীর বৈশিষ্ট্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এক শতাব্দীর সেতু
১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অস্কার ক্লাইন মারা যান। তাঁর স্মৃতিতে ১৯৮৮ সাল থেকে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় ও রয়াল সুইডিশ বিজ্ঞান একাডেমির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে অস্কার ক্লাইন স্মারক বক্তৃতা। সেই সাথে দেওয়া হচ্ছে ক্লাইন পদক। ২০২৬ সালে সেই সম্মান পেয়েছেন বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন।
এই সংযোগটি সুন্দর। ক্লাইন খুঁজেছিলেন অতিরিক্ত মাত্রার সাহায্যে প্রকৃতির ভিন্ন বলকে এক করার পথ। বহু দশক পরে অশোক সেন কাজ করছেন স্ট্রিং থিওরির এমন এক কাঠামো নিয়ে, যেখানে অতিরিক্ত মাত্রা ও মহাকর্ষ আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব ধারণা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির সঠিক বর্ণনা হয় না। কিন্তু কিছু ধারণা প্রশ্ন করার ধরনটাই বদলে দেয়। অস্কার ক্লাইন আমাদের সামনে তেমনই একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন, মহাবিশ্ব কি কেবল ততটুকুই, যতটুকু আমরা দেখতে পাই? এর উত্তর এখনো আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি।
