আইনস্টাইনের প্রশ্ন
১৮৯৫ সাল। আইনস্টাইনের বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। তাঁর মনে জেগে উঠল এক অদ্ভুত প্রশ্ন — একটি আলোর রশ্মির পাশে, ঠিক আলোর গতিতে ছুটতে পারলে কী দেখতাম?
দুটি ট্রেন পাশাপাশি একই দিকে একই গতিতে চললে এক ট্রেন থেকে অন্য ট্রেনটিকে স্থির মনে হয়। তাহলে আলোর ক্ষেত্রেও কি এমন হবে? আলোর গতিতে ছুটলে কি পাশের আলোর রশ্মিটিকেও স্থির মনে হবে?
কিশোর আইনস্টাইনের এই প্রশ্ন পরে তাঁর চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
আলোর অদ্ভুত নিয়ম
কিন্তু সমস্যা হলো, আলো সাধারণ কোনো চলন্ত বস্তুর মতো আচরণ করে না। আপনি আলোর উৎসের দিকে ছুটুন বা উৎস থেকে দূরে সরে যান — শূন্যস্থানে আলোর গতি সব পর্যবেক্ষকের কাছেই একই থাকে।
ধরা যাক, একটি গাড়ি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে চলছে। আপনি আরেকটি গাড়িতে একই দিকে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চলছেন। আপনার কাছে প্রথম গাড়িটির আপেক্ষিক গতি হবে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার।
কিন্তু আলোর ক্ষেত্রে এই সাধারণ হিসাব খাটে না।
আপনি যত দ্রুতই আলোর পেছনে ছুটুন, আপনার কাছে আলো ধীর মনে হবে না। শূন্যস্থানে আলোর গতি থাকবে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার।
তাহলে বদলায় কী?
এখানেই প্রকৃতি আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয়। আলোর গতি যদি সবার জন্য একই থাকে, তাহলে সময় ও দূরত্ব সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা বদলাতে হবে।
একজন পর্যবেক্ষকের তুলনায় খুব দ্রুত চলা কোনো ঘড়িকে ধীরে চলতে দেখা যায়। গতির দিক বরাবর কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্যও ছোট বলে মনে হয়। এমনকি দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে কি না, সেটিও সব পর্যবেক্ষকের কাছে এক নাও হতে পারে।
অর্থাৎ সবার জন্য অভিন্ন কোনো মহাজাগতিক ঘড়ি বা স্কেল নেই।
১৯০৫ সালে, ২৬ বছর বয়সে, আইনস্টাইন এসব ধারণাকে গাণিতিক কাঠামোয় সাজিয়ে প্রকাশ করলেন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।
ভরের মধ্যে শক্তি
এই তত্ত্বের ধারাবাহিকতায় আইনস্টাইন আরেকটি চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। ভর ও শক্তির মধ্যে গভীর সমতুল্য সম্পর্ক রয়েছে। কোনো বস্তু স্থির থাকলেও তার ভরের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি যুক্ত থাকে।
তিনি এই সম্পর্কটি প্রকাশ করেন এই বিখ্যাত সমীকরণটি দিয়ে:
E = mc²
এখানে E হলো শক্তি, m হলো ভর এবং c হলো আলোর গতি।
আলোর গতির বর্গ একটি বিশাল সংখ্যা। তাই সামান্য ভরের সঙ্গেও বিপুল শক্তি জড়িত। মাত্র এক গ্রাম পদার্থের পুরো ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হলে প্রায় ৯০ ট্রিলিয়ন জুল শক্তি পাওয়া যাবে। ভর-শক্তির এই সম্পর্ক পরমাণু ও নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আলোর গতিতে চলা?
এখানে রয়েছে আরেকটি চমক।
ভরযুক্ত কোনো বস্তু শূন্যস্থানে আলোর গতিতে পৌঁছাতে পারে না। বস্তুটিকে যত দ্রুত করা হবে, তাকে আরও দ্রুত করতে তত বেশি শক্তির প্রয়োজন হবে। আলোর গতির যত কাছে যাওয়া যাবে, প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণও তত বাড়বে। আর আলোর গতিতে পৌঁছাতে অসীম শক্তি প্রয়োজন হবে, যেটা বাস্তবে সম্ভব নয়।
তাই আইনস্টাইনের কিশোর বয়সের সেই কল্পনায় আলোক রশ্মির পাশে আলোর গতিতে ছোটা সম্ভব নয়।
মহাকর্ষের নতুন ব্যাখ্যা
কিন্তু আইনস্টাইন এখানেই থামেননি। বিশেষ আপেক্ষিকতা ব্যাখ্যা করেছিল সমবেগে চলা পর্যবেক্ষকদের কাছে স্থান ও কালের সম্পর্ক। এরপর তাঁর সামনে আরও বড় প্রশ্ন দেখা দিল, মহাকর্ষকে এর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে কীভাবে?
প্রায় দশ বছর চিন্তাভাবনার পর, ১৯১৫ সালে তিনি হাজির করলেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। নিউটনের তত্ত্বে মহাকর্ষকে দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আইনস্টাইন দেখালেন, এর আরও গভীর ব্যাখ্যা রয়েছে। মহাকর্ষকে বোঝা যায় স্থান-কালের বক্রতা হিসেবে।
সূর্যের মতো বিশাল ভর তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। পৃথিবী সেই বাঁকানো স্থান-কালের মধ্য দিয়েই স্বাভাবিক পথে চলে। আমরা সেটিকেই সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথ হিসেবে দেখি। সাধারণ আপেক্ষিকতায় মহাকর্ষ তাই শুধু একটি প্রচলিত বল নয়; এটি স্থান-কালের জ্যামিতির প্রকাশ।
সবকিছু কি আপেক্ষিক?
এখানে মজার একটি বিষয় আছে। আইনস্টাইনের তত্ত্বের নাম ‘আপেক্ষিকতা’ হলেও এর অর্থ এই নয় যে মহাবিশ্বের সবকিছুই আপেক্ষিক।
বরং তত্ত্বটির কেন্দ্রে রয়েছে এমন কিছু বিষয়, যেটা সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই থাকে। যেমন শূন্যস্থানে আলোর গতি। পর্যবেক্ষকভেদে সময়ের ব্যবধান, দূরত্ব কিংবা দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে কি না, এসবের পরিমাপ বদলাতে পারে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম বদলায় না।
১৬ বছরের এক কিশোর শুধু জানতে চেয়েছিল, আলোর পাশে ছুটলে আলোকে কেমন দেখাবে? সেই একটি প্রশ্নের পথ ধরে সময়, স্থান, ভর, শক্তি ও মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে গেল।
কখনো কখনো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিপ্লব শুরু হয় খুব ছোট একটি প্রশ্ন থেকে।
