মূল কন্টেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › বিজ্ঞানীদের কথা › মহাবিশ্বের সুরসন্ধানী

মহাবিশ্বের সুরসন্ধানী

২৪ অক্টোবর, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৬ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
মহাবিশ্বের সুরসন্ধানী

একটি বেহালার তার থেকে কত রকম সুর বেরিয়ে আসে। তারের কম্পন বদলালে বদলে যায় সুর। মহাবিশ্বের একেবারে গভীরেও কি এমন কিছু ঘটছে? ইলেকট্রন, কোয়ার্ক কিংবা অন্য মৌলিক কণাগুলো কি আসলে অতি ক্ষুদ্র কোনো কিছুর আলাদা আলাদা কম্পন?

স্ট্রিং থিওরির কেন্দ্রে রয়েছে এমনই এক বিস্ময়কর ধারণা। আর এই তত্ত্বকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম অগ্রগণ্য গবেষক বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর অশোক সেন।

সম্প্রতি তিনি পেয়েছেন ২০২৬ সালের অস্কার ক্লাইন পদক। এটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মান। এর আগে এই পদক পেয়েছেন স্টিফেন হকিং, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ, পিটার হিগস, এডওয়ার্ড উইটেন ও কিপ থর্নের মতো বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীরা। এবার সেই সম্মানিত তালিকায় যুক্ত হলো অশোক সেনের নাম।

গত ২২ অক্টোবর স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দিয়েছেন অস্কার ক্লাইন স্মারক বক্তৃতা। তাঁর বক্তৃতার শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘স্ট্রিং থেকে মহাকর্ষ, মহাকর্ষ থেকে স্ট্রিং’।

অশোক সেনের জন্ম ১৯৫৬ সালে। কলকাতার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। এরপর কানপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

বিদেশে গবেষণার পর ভারতে ফিরে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এলাহাবাদের হরিশচন্দ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তিনি বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র স্ট্রিং থিওরি।

দুই জগতের সেতু

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুটি বড় স্তম্ভ রয়েছে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা ব্যাখ্যা করে মহাকর্ষ ও স্থানকালের বক্রতা। অন্যদিকে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে অণু-পরমাণু ও ক্ষুদ্র কণাদের আচরণ।

নিজ নিজ ক্ষেত্রে দুটো তত্ত্বই অত্যন্ত সফল। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের গভীরে কিংবা মহাবিশ্বের জন্মের একেবারে আদিম পর্যায়ে মহাকর্ষের পাশাপাশি কোয়ান্টাম প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানেই এই দুই তত্ত্বকে এক কাঠামোয় আনার প্রয়োজন দেখা দেয়।

স্ট্রিং থিওরি এই ব্যবধান ঘোচানোর একটি তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা। এখানে মৌলিক কণাকে বিন্দুর মতো না ধরে ভাবা হয় অতি ক্ষুদ্র একমাত্রিক স্ট্রিং হিসেবে। এই স্ট্রিংয়ের ভিন্ন ভিন্ন কম্পন প্রকাশ পেতে পারে ভিন্ন ভিন্ন কণা হিসেবে। এই কাঠামোর মধ্যেই মহাকর্ষকে কোয়ান্টামভাবে বর্ণনা করা সম্ভবনা রয়েছে।

অঙ্কের অন্য দরজা

অশোক সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো এস-ডুয়ালিটি নিয়ে তাঁর কাজ।

কণাদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া খুব প্রবল হলে তাদের আচরণ অঙ্ক কষে বোঝা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, একই বিষয়কে আরেকভাবে বর্ণনা করলে সেই ক্রিয়া দুর্বল হয়ে দেখা দিতে পারে। তখন হিসেব করাও সহজ হয়। সেই সহজ হিসেব দিয়ে মূল কঠিন সমস্যাটি বোঝা যায়।

প্রবল আর দুর্বল ক্রিয়ার এই যোগসূত্রই এস-ডুয়ালিটির মূল ধারণা। অনেকটা দুর্ভেদ্য কোনো দুর্গের অন্য পাশে খোলা দরজা খুঁজে পাওয়ার মতো!

অশোক সেন নির্দিষ্ট কিছু তত্ত্বে এই সম্পর্কের পক্ষে জোরালো গাণিতিক সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর কাজ আলাদা মনে হওয়া স্ট্রিং তত্ত্বগুলোর মধ্যে গভীর যোগসূত্র বোঝার পথ খুলে দিয়েছে।

ব্ল্যাকহোলের গোপন হিসাব

তাঁর আরেকটি বড় গবেষণাক্ষেত্র হলো, ব্ল্যাকহোলের এনট্রপি। এখানে এনট্রপি বলতে শুধু বিশৃঙ্খলা বোঝালে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। বাইরে থেকে কোনো ব্যবস্থার অবস্থা একই থাকলেও ভেতরে তার বহু রকম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্যাস থাকতে পারে। এমন সম্ভাব্য বিন্যাস যত বেশি, এনট্রপিও তত বেশি।

ব্ল্যাকহোলেরও এনট্রপি আছে। কিন্তু সেই এনট্রপির পেছনে কী ধরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবস্থা কাজ করে?

অশোক সেন বিশেষ কিছু ধরনের ব্ল্যাকহোলের এনট্রপি গণনার শক্তিশালী পদ্ধতি তৈরি করেছেন। তাঁর গবেষণা ব্ল্যাকহোলের বৃহৎ পরিসরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তার সম্ভাব্য কোয়ান্টাম অবস্থাগুলোর হিসাব মেলাতে সাহায্য করেছে। মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম জগতের সম্পর্ক বোঝার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

স্বীকৃতি ও সীমারেখা

২০১২ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম দফার ব্রেকথ্রু পুরস্কারজয়ীদের একজন। ২০১৪ সালে পান ডিরাক পদক। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো অস্কার ক্লাইন পদক।

তবে একটি কথা স্পষ্ট রাখা দরকার। স্ট্রিং থিওরি এখনও পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অশোক সেনের গাণিতিক সাফল্য আর প্রকৃতিতে স্ট্রিংয়ের অস্তিত্ব পরীক্ষায় শনাক্ত করা — দুটি আলাদা বিষয়।

তবু তাঁর কাজের গুরুত্ব অনেক। মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের উত্তর খুঁজতে তিনি এমন সব গাণিতিক পথ খুলেছেন, যেগুলো ধরে এগোচ্ছেন অন্য গবেষকেরাও।

আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি নক্ষত্রের আলো। আর অশোক সেন তাঁর সমীকরণের মধ্যে খোঁজেন সেই আলো, সেই নক্ষত্র আর স্থানকালের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর রহস্য।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।