Homeবিজ্ঞানীদের কথাবিশ শতকের বিশজন বিজ্ঞানী

বিশ শতকের বিশজন বিজ্ঞানী

বিশ শতক শুধু বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগ ছিল না। এটি ছিল বাস্তবতাকে পুনরাবিষ্কারের যুগ। এই সময়ে হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন। তারা শুধু নতুন তত্ত্ব দেননি; বাস্তবতাকে বোঝার ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন। পরমাণুর গভীর জগত থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের বিশাল কাঠামো পর্যন্ত, সবকিছুকে তাঁরা নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছেন।
এই বিজ্ঞান বিপ্লবের কেন্দ্রে ছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। তিনি দেখিয়েছিলেন, স্থান আর কাল আলাদা কিছু নয়; তারা একসাথে মিলে তৈরি করে স্পেসটাইম। তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব নিউটনের শতাব্দী-পুরোনো ধারণাকে ভেঙে দিয়ে মহাবিশ্বের এক নতুন চিত্র তুলে ধরে। ফটোইলেকট্রিক প্রভাব নিয়ে তাঁর গবেষণাই পরে কোয়ান্টাম বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার জন্ম দেয়।
আর সেই কোয়ান্টাম বিপ্লবের অন্যতম নীরব স্থপতি ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি দেখিয়েছিলেন, আলোর কণাগুলোকে আলাদা আলাদা সত্ত্বা হিসেবে নয়, বরং অভিন্ন কোয়ান্টাম কণা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর সেই বিপ্লবী ধারণাই পরে “বোসন” নামের এক নতুন কণাজগতের জন্ম দেয়। আইনস্টাইন তাঁর কাজের গুরুত্ব বুঝে সেটিকে আরও বিস্তৃত করেন। আজকের লেজার, সুপারফ্লুইডিটি, বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট কিংবা হিগস বোসনের মতো ধারণার গভীরে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর চিন্তার ছাপ রয়ে গেছে।
মজার ব্যাপার হলো, তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি প্রথমে একটি বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞান জার্নাল প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছিল। তখন সত্যেন্দ্রনাথ বসু সরাসরি আইনস্টাইনের কাছে সেটি পাঠান। আইনস্টাইন কাজটির গুরুত্ব বুঝে নিজেই জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। ইতিহাসে খুব কম বৈজ্ঞানিক ধারণাই এমন নাটকীয় পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
এরও আগে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক আর নীলস বোর খুলে দেন কোয়ান্টাম জগতের দরজা। প্ল্যাঙ্ক প্রথম দেখান, শক্তি অবিচ্ছিন্ন নয়; এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্যাকেট বা “কোয়ান্টা” আকারে বিনিময় হয়। আর বোর পরমাণুর নতুন মডেল দাঁড় করিয়ে দেখালেন, ইলেকট্রন নিউটনের ক্লাসিক্যাল নিয়মে নয়, বরং এক অদ্ভুত কোয়ান্টাম নিয়মে আচরণ করে।
এরপর মঞ্চে আসেন লুই দ্য ব্রয়ী, ভের্নার হাইজেনবার্গ আর এরভিন শ্রোডিঙ্গার। দ্য ব্রয়ী প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন, শুধু আলোর নয়, পদার্থেরও তরঙ্গ ধর্ম থাকতে পারে। তাঁর সেই ধারণাই পরে ইলেকট্রন তরঙ্গের বাস্তব প্রমাণে রূপ নেয় এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তিকে আরও গভীর করে তোলে। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি জানিয়ে দিল, প্রকৃতির গভীরে নিশ্চিত বলে কিছু নেই। অন্যদিকে শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ প্রথমবারের মতো দেখিয়ে দিল, কোয়ান্টাম জগতে ইলেকট্রনের আচরণকে সম্ভাবনার ভাষায় কীভাবে বর্ণনা করা যায়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পুরো কাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে এই বিজ্ঞানীদের কাজের উপর।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এই নতুন জগৎ এতটাই অদ্ভুত ছিল যে এর ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যেই দীর্ঘ বিতর্ক শুরু হয়।
আইনস্টাইন পর্যন্ত এই তত্ত্বের কিছু দিক মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু পরীক্ষার পর পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত কোয়ান্টাম তত্ত্বের পক্ষেই রায় দিয়েছে।
তারপর পল ডিরাক কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আর আপেক্ষিকতাকে এক সুতোয় গেঁথে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অ্যান্টিম্যাটারের অস্তিত্ব। পরে পরীক্ষায় সেটি সত্য প্রমাণিত হয়। ডিরাক ছিলেন অত্যন্ত নীরব ও সংযত মানুষ। কিন্তু তাঁর সমীকরণই এমন এক কণার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, যাকে তখন কেউ কখনো দেখেনি। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই অ্যান্টিম্যাটার বাস্তবে আবিষ্কৃত হয়।
রিচার্ড ফাইনম্যান আবার জটিল কোয়ান্টাম তত্ত্বকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যেটা আজও কণা পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাঁর বিখ্যাত ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম কণার পারস্পরিক ক্রিয়াকে বোঝার এক নতুন পদ্ধতি তৈরি করে দেয়।
পরবর্তীতে এনরিকো ফার্মি আর উলফগ্যাং পাউলি পদার্থের গঠন বোঝার ভিত্তি গড়ে দেন। পাউলির বর্জন নীতি দেখালো, একই পরমাণুর ভেতরে দুটি ইলেকট্রন কখনোই সম্পূর্ণ একই কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকতে পারে না। এই বর্জন নীতির কারণেই পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস তৈরি হয়, রসায়নের বৈচিত্র্য জন্ম নেয় এবং দৃশ্যমান পদার্থ স্থিতিশীল থাকে।
আর ফার্মির পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করলো, বিপুল সংখ্যক ফার্মিয়ন কণা কীভাবে একসাথে আচরণ করে। শ্বেত বামন নক্ষত্রের অতিঘন পদার্থ থেকে শুরু করে ধাতুর ইলেকট্রনের আচরণ, সেমিকন্ডাক্টর এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের বহু মৌলিক বৈশিষ্ট্য এই তত্ত্বের মাধ্যমেই বোঝা গেল।
অন্যদিকে মেরি কুরি ছিলেন পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের এক কিংবদন্তি। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর গবেষণা পুরো নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের পথ খুলে দেয়। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন, বিজ্ঞানের এই দুই বিষয়েই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে জে. রবার্ট ওপেনহাইমার, মারে গেল-ম্যান আর লেভ ল্যান্ডাউ পদার্থবিজ্ঞানের দিগন্তকে আরও প্রসারিত করেন। ওপেনহাইমার কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি ম্যানহাটন প্রজেক্টের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গেল-ম্যান কোয়ার্ক মডেল প্রস্তাব করে কণার বিশৃঙ্খল “চিড়িয়াখানাকে” শৃঙ্খলিত করেন। আর ল্যান্ডাউ সুপারফ্লুইডিটি নিয়ে কাজ করে সোভিয়েত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এক বিশাল স্কুল গড়ে তোলেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজন্মের পর প্রজন্মের পদার্থবিদ তাঁর তৈরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছেন।
অপর দিকে, জন বারডিন ছিলেন এক বিস্ময়কর মানুষ। তিনিই একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি পদার্থবিজ্ঞানে দুইবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ট্রানজিস্টর আর সুপারকন্ডাক্টিভিটির তত্ত্বে তাঁর অবদান ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির পৃথিবী কল্পনাই করা যেত না। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। দুইবার নোবেল জয়ী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো প্রচারের আলোয় থাকতে পছন্দ করতেন না।
বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে আব্দুস সালাম, স্টিভেন ওয়েইনবার্গ আর শেলডন গ্লাশো দেখিয়েছিলেন, বিদ্যুৎচুম্বকত্ব আর দুর্বল নিউক্লিয়ার বল আসলে একই মৌলিক বলের দুটি ভিন্ন রূপ। এটি ছিল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর ঐক্যবদ্ধ ধারণাগুলোর একটি। এই কাজই পরবর্তীতে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তরুণ সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর দেখিয়েছিলেন, নক্ষত্রের জীবনও চিরন্তন নয়। তিনি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন, একটি নক্ষত্রের ভর যদি নির্দিষ্ট সীমার বেশি হয়, তবে সেটি সাদা বামন হিসেবে স্থিতিশীল থাকতে পারবে না। পরে সেটি নিউট্রন তারকা কিংবা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে। আজ “চন্দ্রশেখর সীমা” আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ধারণা।
কিন্তু তাঁর এই ধারণা প্রথমে সবাই গ্রহণ করেনি। তবুও তিনি নিজের গবেষণা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই তাঁর পক্ষ নিয়েছিল। নক্ষত্রের মৃত্যু ও ব্ল্যাক হোলের আধুনিক ধারণার ভিত্তি গড়ে ওঠে তাঁর কাজের উপর। তবে এই স্বীকৃতির জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময়।
এই অসাধারণ মানুষগুলো শুধু পদার্থবিজ্ঞানকে এগিয়ে নেননি। তারা আমাদের বাস্তবতাকে দেখার পদ্ধতিই বদলে দিয়ে গেছেন। আজকের কম্পিউটার, লেজার, সেমিকন্ডাক্টর, নিউক্লিয়ার শক্তি, মহাকাশ গবেষণা কিংবা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং- সব কিছুর গভীরে কোথাও না কোথাও তাঁদের চিন্তার ছাপ লুকিয়ে আছে।
বিশ শতকের এই বিশজন মহাবিজ্ঞানী মহাবিশ্বের ভাষা নতুন করে লিখেছিলেন। একুশ শতকে দাঁড়িয়েও আমরা এখনো সেই ভাষা পড়ে মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্য বোঝার চেষ্টা করে চলেছি। তাঁদের অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়েছি, কিন্তু আরও অনেক প্রশ্ন আজও আমাদের সামনে খোলা রয়ে গেছে। আর সেই অনুসন্ধানের পথেই এগিয়ে চলেছে আধুনিক বিজ্ঞান।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular