মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাজীবনের বিজ্ঞানঅভিনব একটি পরীক্ষা এবং একটি ‌আবিষ্কারের…

অভিনব একটি পরীক্ষা এবং একটি ‌আবিষ্কারের কাহিনি RecD জিন

১১ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৫ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১৫৪ 💬 ০
অভিনব একটি পরীক্ষা এবং একটি ‌আবিষ্কারের কাহিনি RecD জিন
১৯৮২ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের একটি গবেষণাগারে বসে একজন তরুণ বাংলাদেশি গবেষক পিএইচডির কাজ করছেন। তার নাম আবদুল এম. চৌধুরী। আজ তাকে আমরা ড. আবেদ চৌধুরী নামে চিনি। বাংলাদেশে ছিলেন রসায়নের ছাত্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি মলিকিউলার বায়োলজিতে আগ্রহী হয়ে গবেষণার কাজ শুরু করলেন।
তার অধ্যাপক একদিন তাকে‌‌ ডেকে মলিকিউলার বায়োলজির একটি সমস্যার কথা বললেন। কাজটি খুব সহজ ছিল না। কারণ বহু খ্যাতিমান বিজ্ঞানী বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে চলেছেন।

ডিএনএ মেরামতের সমস্যা

ডিএনএকে বলা হয় জীবনের নীলনকশা। কিন্তু এই নকশা সব সময় অক্ষত থাকে না। নানা কারণে ডিএনএ প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জীবদেহের ভেতরে ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করার জন্য অত্যন্ত জটিল কিছু ব্যবস্থা রয়েছে।
ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা জানতেন, RecB ও RecC নামের দুটি প্রোটিন সাব-ইউনিট মিলে এক্সোনিউক্লিয়েজ ফাইভ (Exonuclease V) নামের একটি জটিল এনজাইম ব্যবস্থা তৈরি করে। এটি ডিএনএ মেরামত এবং জিনগত পুনর্গঠনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু এখানে একটি সমস্যা ছিল। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, RecB ও RecC- এই দু’টিই এ কাজের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কিছু কিছু পরীক্ষায় দেখা গেল, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। কোথাও যেন আরেকটি অজানা উপাদান লুকিয়ে আছে। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই তরুণ গবেষক আবেদ চৌধুরী একটি অভিনব পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিলেন।

উল্টো পথে হাঁটা

তখন বিজ্ঞানীরা পরীক্ষার জন্য পেট্রি ডিশে প্রথমে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দিতেন। তারপর তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হতো এক ধরনের বিশেষ ভাইরাস, যার নাম ব্যাকটেরিওফাজ। ফাজের সাথে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখে বিভিন্ন ধরনের মিউট্যান্টকে শনাক্ত করা হতো।
কিন্তু আবেদ চৌধুরী ঠিক তার উল্টো কাজটিই করলেন। তিনি পেট্রি ডিশে ভাইরাস নিয়ে  তার ওপর ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দিলেন। সহকর্মীরা অবাক হয়ে গেলেন। কেউ কেউ বললেন, এই অদ্ভুত পরীক্ষা থেকে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। পরে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে ড. চৌধুরী বলেছেন, এই ধারণাটি তার মাথায় এসেছিল অনেকটা কবিতার একটি নতুন পঙ্ক্তির মতো।
এই অভিনব পরীক্ষার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, এটি একটি কার্যকর বাছাই-পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছিল। পেট্রি ডিশের পরিবেশটাই যেন একটি ফিল্টারের মতো কাজ করত। ফলে সাধারণ ব্যাকটেরিয়াগুলো বাদ পড়ে যেত, আর বিরল মিউট্যান্টগুলো সহজেই চোখে পড়ত।

অদ্ভুত ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান

এই অভিনব পরীক্ষার মাধ্যমে আবেদ চৌধুরী অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার ব্যাকটেরিয়ার আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে পারলেন। এরপর তিনি কয়েকটি অদ্ভুত মিউট্যান্টের সন্ধান পেলেন।
এদের আচরণ ছিল অদ্ভুত। এক্সোনিউক্লিয়েজ ফাইভের স্বাভাবিক নিউক্লিয়েজ কার্যকলাপ তাদের ছিল না, অথচ জিনগত পুনর্গঠন ও ডিএনএ মেরামতের ক্ষমতা তাদের অনেকটাই অক্ষুণ্ণ ছিল। তিনি তখন বুঝতে পারলেন, এখানে নিশ্চয়ই আরেকটি অজানা জিন কাজ করছে।

নতুন জিনের সন্ধান

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সেই জিনের সন্ধান পাওয়া গেল। তার নাম দেওয়া হলো RecD। এই জিনটি RecD নামে একটি প্রোটিন তৈরি করে, যেটি এক্সোনিউক্লিয়েজ ফাইভের তৃতীয় সাব-ইউনিট হিসেবে কাজ করে। এর আণবিক ওজন প্রায় ৫৮ কিলোডালটন।
এখন থেকে ঠিক চার দশক আগে, ১৯৮৬ সালের আগস্ট মাসে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান জার্নাল, প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (PNAS)-এ এই নতুন জিন আবিষ্কারের বিষয়ে আবেদ চৌধুরী ও তার সহকর্মীদের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল,
recD: the gene for an essential third subunit of exonuclease V।

সাধারণ পরীক্ষার অসাধারণ ফল

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পেছনে কোনো জটিল যন্ত্রপাতি ছিল না। ছিল শুধু একটি অভিনব ধারণা। আবেদ চৌধুরীর মতে, এটি ছিল অনেকটা হাইস্কুলের পরীক্ষাগারের একটি সাধারণ পরীক্ষার মতো। অথচ সেই পরীক্ষাই মলিকিউলার বায়োলজির একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। যে সমস্যার সমাধান করতে বহু বিজ্ঞানী বছরের পর বছর চেষ্টা করেছিলেন, সেই সমস্যার সমাধান মিলেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উপায়ে।

নোবেলজয়ীর চিঠি

এই নতুন জিন আবিষ্কারের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক স্টাল আবেদ চৌধুরীকে চিঠি লিখে অভিনন্দন জানালেন। জিন প্রকৌশলের অন্যতম পথিকৃৎ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হ্যামিলটন ও. স্মিথ চিঠি লিখে তাঁর কাজের প্রশংসা করলেন।
পরপর দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো PNAS জার্নালে। পরে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো নিউইয়র্কের বিখ্যাত কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরিতে। সেখানে হোমোলগাস রিকম্বিনেশনের ক্ষেত্রে নতুন এই জিনের আবিষ্কার নিয়ে তার সঙ্গে কথা হলো ডিএনএ ডাবল হেলিক্সের সহ-আবিষ্কারক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জেমস ডি. ওয়াটসনের।  এটি ছিল তরুণ আবেদ চৌধুরীর জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

তরুণদের জন্য পরামর্শ

দীর্ঘ গবেষণা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ড. আবেদ চৌধুরী তরুণদের একটি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “অন্যের পথ অনুসরণ করো না, নিজের পথ তৈরি করো। এমন প্রশ্ন খুঁজে বের করো, যার উত্তর এখনো কেউ জানে না। তারপর সেই উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করো।”
তার বিশ্বাস, পৃথিবীতে এখনো অসংখ্য আবিষ্কার অপেক্ষা করে আছে। দরকার শুধু কৌতূহল, কল্পনাশক্তি এবং প্রচলিত ধারণার বাইরে চিন্তা করার সাহস।

শেষ কথা

বিজ্ঞানের ইতিহাসে বড় বড় অনেক আবিষ্কারের পেছনে প্রায়ই ছোট ছোট গল্প লুকিয়ে থাকে। RecD জিনের আবিষ্কারের গল্পটিও তেমনই একটি গল্প। বাংলাদেশী একজন তরুণ গবেষক সবার উল্টো পথে হাঁটার সাহস করেছিলেন। আর সেই সাহসই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ এক নতুন আবিষ্কারের দোরগোড়ায়।

তথ্যসূত্র: ড. সুসান কে. অ্যামান্ডসেন, অ্যান্ড্রু এফ. টেলর, আবদুল এম. চৌধুরী এবং জেরাল্ড আর. স্মিথ (১৯৮৬), recD: the gene for an essential third subunit of exonuclease V, (PNAS); আবদুল এম. চৌধুরী এবং জেরাল্ড আর. স্মিথ (১৯৮৪), A new class of Escherichia coli recBC mutants: Implications for the role of RecBC enzyme in homologous recombination, (PNAS); এবং ড. আবেদ চৌধুরীর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।