এআই দিয়ে নতুন ভাইরাস তৈরি: ইভো-২ মডেল ও আগামীর শঙ্কা
চ্যাটজিপিটিকে গল্প লিখতে বললে মুহূর্তের মধ্যেই নতুন একটি গল্প লিখে দেয়। এর কারণ হলো, চ্যাটজিপিটিকে মানুষের ভাষা শেখানো হয়েছে। আর এখন সেই একই কৌশল ব্যবহার করে একটি এআই মডেলকে ডিএনএ বা জিনের ভাষা শেখানো হয়েছে। এরপর এআই মডেলটিকে এমন সব জিনগত বিন্যাস খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে, যেগুলো ই- কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে।
সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ঠিক এই কাজটিই করেছেন। তাঁরা ইভো-২ (Evo 2) নামের একটি এআই মডেলের সাহায্যে এমন কিছু ভাইরাসের নকশা তৈরি করেছেন, যেগুলো প্রকৃতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি।
ইভো-২ এর প্রশিক্ষণ
চ্যাটজিপিটির মতো ভাষাভিত্তিক মডেল মানুষের লেখা পড়ে শব্দের ধরন শেখে। কিন্তু ইভো-২ শিখেছে জীবজগতের ভাষা, অর্থাৎ ডিএনএ বর্ণমালার চারটি অক্ষর – A, T, G এবং C।
এই এআই মডেলটিকে ৯ ট্রিলিয়নেরও বেশি নিউক্লিওটাইডের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মডেলটি বুঝতে শিখেছে, কোন ধরনের জিনগত বিন্যাস জীবজগতের জন্য কার্যকর হতে পারে।
গবেষণার লক্ষ্য ছিল ব্যাকটেরিওফাজ
গবেষকেরা ΦX174 (ফাই-এক্স-১৭৪) নামের একটি ব্যাকটেরিওফাজকে বেছে নেন। ব্যাকটেরিওফাজ হলো এমন এক ধরনের ভাইরাস, যেটা মানুষের শরীর নয়, বরং ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে। আর এই বিশেষ ভাইরাসটি শুধুমাত্র ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে।
প্রথমে ইভো-২ এআই হাজার হাজার সম্ভাব্য জিনোমের নকশা তৈরি করেছিল। তারপর গবেষকেরা সেখান থেকে প্রায় ৩০০টি নকশা বেছে নিয়ে পরীক্ষাগারে ডিএনএ সংশ্লেষণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে ১৬টি সম্পূর্ণ কার্যকর ভাইরাস পাওয়া গেছে।
গবেষণার গুরুত্ব
আজকের পৃথিবীতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত ওষুধ কাজ করছে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা ব্যাকটেরিওফাজ ভবিষ্যতে এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং এক অর্থে, এই প্রযুক্তি রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে আরেক ধরনের জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিতে পারে।
উদ্বেগও কম নয়
তবে এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে নতুন উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হতে পারে। বর্তমানের প্রচলিত জৈব নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচিত জীবাণুর জন্য তৈরি করা হয়েছে। তাই এআই যদি সম্পূর্ণ নতুন কোনো জীবাণু তৈরি করে ফেলে, তাহলে সেটিকে শনাক্ত করা সহজ হবে না।
অবশ্য গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদকে সংক্রমিত করে এমন কোনো ভাইরাসের তথ্য ব্যবহার করেননি।
নতুন যুগের সূচনা
১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী ফ্রেড স্যাঙ্গার প্রথম কোনো জীবের সম্পূর্ণ জিনোমের ক্রম নির্ধারণ করেছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে এসে আমরা এমন এক যুগে এসে পৌঁছেছি, যখন কম্পিউটার সৈন্য জিনোম পড়ছে না, বরং নতুন জিনোম লিখেও দিচ্ছে। বিষয়টি শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও, বাস্তবে এর সূচনা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য কোন নতুন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে কিনা।
হকিংয়ের সতর্কবার্তা
এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের সতর্কবার্তার কথা মনে পড়ে গেল। হকিং বহু বছর আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অসীম সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক সীমারেখা এবং আন্তর্জাতিক তদারকি না থাকলে এই প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাঁর সেই সতর্কবার্তা আজ আর নিছক কল্পনা বলে মনে হয় না।
