এআই দিয়ে জিন এডিটিং
জীবজগতের কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে যে প্রোটিন কখনো তৈরি হয়নি, তেমন একটি নতুন প্রোটিন যদি কম্পিউটার নিজেই নকশা করে দেয়, আর সেটা দিয়ে যদি জিন এডিটিং করা যায়, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়?
শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বিজ্ঞানীরা এখন ঠিক সেই কাজটিই করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল ব্যবহার করে তাঁরা তৈরি করেছেন নতুন ধরনের জিন এডিটিং এনজাইম। আর এগুলো শুধু কম্পিউটারের পর্দায় তৈরি কোনো কাল্পনিক প্রোটিন নয়। পরীক্ষাগারে জীবন্ত কোষে এগুলো সত্যি সত্যিই ডিএনএ সম্পাদনার কাজ করতে পেরেছে।
প্রকৃতির তৈরি কাঁচি
গত এক দশকে জীববিজ্ঞানে সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো ক্রিসপার। সহজ করে বললে, ক্রিসপার হলো ডিএনএর নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে সেখানে কাটাছেঁড়া করার একটি মোক্ষম ব্যবস্থা। একটি গাইড আরএনএ প্রথমে ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশটি চিনে নেয়। এরপর বিশেষ একটি এনজাইম সেখানে গিয়ে ডিএনএ কেটে দেয়। এরপর কোষের নিজস্ব ডিএনএ মেরামত ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা সেই জায়গায় পরিবর্তন আনতে পারেন, যেমন কোনো জিন নিষ্ক্রিয় করতে পারেন। আবার বিশেষ ক্ষেত্রে নতুন ডিএনএও যোগ করতে পারেন। এ কারণেই এই এনজাইমগুলোকে অনেক সময় বলা হয়, মলিকুলার সিজার বা আণবিক কাঁচি।
কিন্তু এই কাঁচি মানুষের তৈরি নয়। প্রকৃতিতে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা আগে থেকেই ছিল। বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির কাছ থেকে সেই কৌশল শিখে সেটিকে জিন সম্পাদনার কাজে ব্যবহার করছেন।
কিন্তু এবার তাঁরা একটু অন্যভাবে চিন্তা করলেন। প্রকৃতির তৈরি আণবিক কাঁচিই শুধু ব্যবহার করতে হবে কেন? প্রয়োজনমতো একেবারে নতুন কাঁচি কি তৈরি করা যায় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কাজে লাগানো হলো এআই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাঁচি
ক্রিসপারের অন্যতম আবিষ্কারক, নোবেল বিজয়ী জেনিফার ডাউডনার গবেষণাগারের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের একটি দল এবার কাজ শুরু করলেন টিএনপি-বি নামে ছোট একটি জিন-এডিটিং এনজাইম নিয়ে। টিএনপি-বি অনেকটা ক্রিসপার-ক্যাস১২ এনজাইম পরিবারের প্রাচীন পূর্বসূরির মতো। এটিও আরএনএর নির্দেশনা অনুসরণ করে ডিএনএর নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে কাটতে পারে।
কীভাবে কাজ করে?
এনজাইম আসলে এক ধরনের প্রোটিন। অন্যান্য প্রোটিনের মতো এনজাইমও তৈরি হয় অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। অনেকগুলো অ্যামিনো অ্যাসিড নির্দিষ্ট ক্রমে পাশাপাশি বসে তৈরি করে একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল। সেই শৃঙ্খল আবার ভাঁজ হয়ে একটি বিশেষ ত্রিমাত্রিক আকৃতি নেয়। আর সেই আকৃতির ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে এনজাইমটি কীভাবে কাজ করবে।
বিজ্ঞানীরা এবার সমস্যাটিকে উল্টো দিক থেকে দেখলেন।
সহজ করে বললে, এআইকে একটি কাঙ্ক্ষিত প্রোটিন কাঠামো দেখিয়ে বলা হলো, এবার তুমি হিসাব করে বলো, কোন কোন অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো কী ক্রমে সাজালে এমন একটি প্রোটিন তৈরি হতে পারে।
তবে এআইকে একেবারে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। প্রকৃতিতে পাওয়া টিএনপি-বি এনজাইমগুলোর বিবর্তনের ইতিহাস থেকে বিজ্ঞানীরা জানতেন, কোন কোন অংশ এর কাজের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেই তথ্যও এআইকে দেওয়া হলো। অর্থাৎ এখানে একসঙ্গে কাজে লাগানো হলো প্রকৃতির কোটি বছরের বিবর্তনের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা।
তৈরি হলো নতুন আণবিক কাঁচি
এভাবে বিপুল সংখ্যক নতুন প্রোটিনের নকশা তৈরি ও যাচাই করা হলো। সেখান থেকে বিজ্ঞানীরা শেষ পর্যন্ত নয়টি নতুন টিএনপি-বি বেছে নিলেন। এদের নাম দেওয়া হলো, সিনটিএনপি-বি।
কিন্তু কম্পিউটারে একটি সুন্দর প্রোটিন বানিয়ে ফেললেই তো আর কাজ শেষ হয়ে যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই জীবন্ত কোষের ভেতর কাজ করবে?
সেটিই এবার পরীক্ষা করে দেখা হলো।
ফলাফল বেশ চমকপ্রদ
এআইয়ের নকশা করা সিনটিএনপি-বি ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ এবং মানুষের কোষে নির্দিষ্ট ডিএনএ চিনে সেখানে সম্পাদনার কাজ করতে পেরেছে। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, পরীক্ষায় এগুলোর জিন-এডিটিং কার্যক্ষমতা প্রাকৃতিক টিএনপি-বি এনজাইমের চেয়েও বেশি ছিল এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য চিনে নেওয়ার ক্ষমতাও মোটামুটি বজায় ছিল।
বিজ্ঞানীরা ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে নতুন এনজাইমগুলোর ত্রিমাত্রিক গঠনও পরীক্ষা করেছেন। দেখা গেছে, এআই এমন কিছু আণবিক বিন্যাস তৈরি করেছে, যেগুলো এনজাইমকে আরএনএ ও ডিএনএর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করছে। অর্থাৎ এআই শুধু পুরোনো কোনো প্রোটিন নকল করেনি। প্রকৃতির নকশাকে ভিত্তি করে নতুন নকশা তৈরি করেছে।
কেন আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ?
এতদিন নতুন জিন এডিটিং এনজাইম খুঁজে পাওয়ার জন্য বিজ্ঞানীদের অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতে হতো। বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের মধ্যে খুঁজে দেখা হতো, আরও ভালো কোনো আণবিক কাঁচি পাওয়া যায় কি না। এখন সেই পদ্ধতিটিই বদলে যেতে পারে।
ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা হয়তো আগে ঠিক করবেন তাঁদের কেমন এনজাইম দরকার। সেটি হতে পারে আকারে ছোট, নির্দিষ্ট ডিএনএ খুব নিখুঁতভাবে চিনতে সক্ষম কিংবা ভুল জায়গায় ডিএনএ কাটার প্রবণতা কম।
তারপর এআই সেই চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রোটিনের নকশা তৈরি করে দেবে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে সেগুলো তৈরি করে দেখবেন কোনটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
এর সম্ভাবনা বিশাল
জিনগত রোগের চিকিৎসা থেকে শুরু করে উন্নত ফসল তৈরি – এরকম অনেক ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। অবশ্য গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। মানুষের রোগের চিকিৎসায় এসব নতুন এনজাইম ব্যবহার করার আগে আরও অনেক গবেষণা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
জীবনের ভাষায় নতুন শব্দ
জীবজগতের প্রোটিনগুলো তৈরি হয়েছে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। মানুষ এতদিন সেই বিশাল ভাণ্ডার থেকে দরকারি প্রোটিন খুঁজে বের করেছে, তাদের গঠন বুঝেছে এবং নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছে।
এআই এসে সেই গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করছে। এখন আমরা আর শুধু প্রকৃতির তৈরি আণবিক যন্ত্র খুঁজে বের করছি না। প্রকৃতির নিয়মগুলো বুঝে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আণবিক যন্ত্রের নকশাও তৈরি করতে শুরু করেছি।
জীবনের ভাষা পড়তে ও শিখতে মানুষের লেগেছে বহু বছর। এখন এআইকে সঙ্গে নিয়ে সেই ভাষায় নতুন শব্দ লিখতেও শুরু করেছে মানুষ।
গবেষণাটি নিয়ে Nature Biotechnology-এর বিস্তারিত প্রতিবেদনের লিঙ্ক।
