মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানবুধের দুয়ারে বেপিকলম্বো

বুধের দুয়ারে বেপিকলম্বো

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১০ 💬 ০
বুধের দুয়ারে বেপিকলম্বো

প্রায় আট বছরের দীর্ঘ মহাকাশ যাত্রা শেষে অবশেষে গন্তব্যের দুয়ারে পৌঁছে গেছে বেপিকলম্বো। এর সামনে এখন সূর্যের সবচেয়ে কাছের এবং সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় গ্রহ- বুধ। বুধ গ্রহ নিয়ে গবেষণার পথিকৃৎ ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিউসেপ্পে ‘বেপি’ কলম্বোর সম্মানে এই মহাকাশ অভিযানের নাম রাখা হয়েছে, বেপিকলম্বো।

তবে বুধের কাছে পৌঁছানো মানেই কাজ শেষ নয়। বরং শুরু হচ্ছে অভিযানের সবচেয়ে কঠিন পর্ব। আগামী কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একের পর এক কৌশল সম্পন্ন করে বেপিকলম্বোর দুটি মহাকাশযানকে বুধের কক্ষপথে নিয়ে আসতে হবে।

আট বছরের দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রাপথ

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ অভিযান বেপিকলম্বো উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর। পৃথিবী থেকে বুধের গড় দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম হলেও সেখানে মহাকাশযান পাঠানো আশ্চর্য রকম কঠিন।

কারণ সূর্যের দিকে এগোতে থাকলে তার প্রবল মহাকর্ষ মহাকাশযানকে ক্রমেই দ্রুত টেনে নিয়ে যায়। বুধের পাশ দিয়ে ছুটে না গিয়ে তার কক্ষপথে ঢুকতে হলে সেই অতিরিক্ত গতি কমাতে হয়। আর সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই বেপিকলম্বোকে প্রায় আট বছর ধরে সৌরজগতের ভেতরে এক বিশাল ঘুরপথে চালানো হয়েছে। এই পথে পৃথিবীকে একবার, শুক্রকে দুবার এবং বুধকে ছয়বার পাশ কাটিয়ে মহাকর্ষীয় সহায়তা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে নয়টি গ্রহীয় ফ্লাইবাই। এই দীর্ঘ যাত্রায় সৌরবিদ্যুৎচালিত আয়ন ইঞ্জিনও ব্যবহার করা হয়েছে।

বুধ কক্ষপথে প্রবেশের চূড়ান্ত অধ্যায়

গত ৩ সেপ্টেম্বর বেপিকলম্বোর যাত্রায় একটি বড় ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত মারকারি ট্রান্সফার মডিউলটি মূল মহাকাশযান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বুধে পৌঁছানোর চূড়ান্ত পর্ব। বেপি-কলম্বো ছুটে চলেছে বুধ গ্রহকে আরও কাছ থেকে জানার জন্য

এখন সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ২১ নভেম্বর। সেদিন বেপিকলম্বোকে বুধের মহাকর্ষের কবলে এনে কক্ষপথে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর ডিসেম্বর মাসে একসঙ্গে এত দূর আসা দুটি অরবিটার একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাবে:

  • মারকারি প্ল্যানেটারি অরবিটার: এটি তৈরি করেছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা।

  • মিও (Mio): জাপানের তৈরি মারকারি ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটার।

দুটি মহাকাশযান একই গ্রহকে দেখবে দুই ভিন্ন দৃষ্টিতে।

বুধ গ্রহের অজানা রহস্য

বুধ দেখতে অনেকটা আমাদের চাঁদের মতো। ধূসর, পাথুরে এবং অসংখ্য গর্তে ভরা। কিন্তু এই ছোট গ্রহটি বিজ্ঞানীদের সামনে বেশ কয়েকটি বড় রহস্য রেখে দিয়েছে:

  • সূর্যের এত কাছে থেকেও বুধের মেরু অঞ্চলের এমন কিছু গর্ত রয়েছে, যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। সেখানে বরফ থাকার শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে।

  • এত ছোট একটি গ্রহের নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। পৃথিবীর মতো বুধের কেন্দ্রেও কীভাবে এখনো এমন চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, তার পুরো উত্তর বিজ্ঞানীদের জানা নেই।

  • বুধের পৃষ্ঠে রয়েছে ‘হলোস’ নামে অদ্ভুত উজ্জ্বল গর্ত ও খাদ। এগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেটিও গবেষণার বিষয়।

  • বিজ্ঞানীরা জানতে চান গ্রহটির অস্বাভাবিক বড় লৌহসমৃদ্ধ কেন্দ্র কীভাবে তৈরি হলো।

দুই অরবিটারের যৌথ মহাকাশ গবেষণাগার

এই কারণেই বেপিকলম্বো মিশন গুরুত্বপূর্ণ। একটি নয়, দুটি অরবিটার একই সময়ে বুধকে পর্যবেক্ষণ করবে। ইউরোপের অরবিটারটি মূলত বুধের পৃষ্ঠ, অভ্যন্তরীণ গঠন, রাসায়নিক উপাদান ও ভূতত্ত্ব পরীক্ষা করবে।

অন্যদিকে জাপানের মিও বেশি নজর দেবে বুধের চৌম্বক ক্ষেত্র, প্লাজমা এবং সূর্য থেকে আসা সৌরবায়ুর সঙ্গে গ্রহটির মিথস্ক্রিয়ার দিকে। দুটি মহাকাশযানের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বুধকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে বোঝার সুযোগ পাবেন বিজ্ঞানীরা। বেপিকলম্বোতে রয়েছে ম্যাগনেটোমিটার, লেজার অল্টিমিটার, এক্স-রে ও ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটার, প্লাজমা ও ধূলিকণা শনাক্তকারীসহ বহু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র।

বুধ গ্রহ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বুধকে বোঝা মানে শুধু একটি গ্রহকে জানা নয়। সূর্যের এত কাছে একটি পাথুরে গ্রহ কীভাবে তৈরি হলো, কেন এর কেন্দ্র এত বড়, কীভাবে এটি বিবর্তিত হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্য পাথুরে গ্রহগুলোর জন্মের ইতিহাস বুঝতেও সাহায্য করতে পারে।

বুধ গ্রহের দিকে প্রথম ছুটে গিয়েছিল মেরিনার-১০ (১৯৭৪-৭৫)। পরে মেসেঞ্জার (২০১১-২০১৫) প্রথমবারের মতো বুধ গ্রহের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করে। বেপিকলম্বো হবে বুধের কক্ষপথে পৌঁছানো দ্বিতীয় অভিযান, আর এর দুটি অরবিটার হবে বুধকে প্রদক্ষিণ করা দ্বিতীয় ও তৃতীয় মহাকাশযান।

সবকিছু পরিকল্পনামতো চললে ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হবে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। আট বছরের যাত্রা তাই প্রায় শেষ, কিন্তু বুধ গ্রহে বিজ্ঞানের আসল অভিযান আগামী এপ্রিলেই শুরু হবে। পৃথিবী থেকে তাকালে বুধ সূর্যের পাশে ছোট্ট একটি আলোর বিন্দু। সেই ছোট্ট বিন্দুর চারপাশে শিগগিরই ঘুরতে থাকবে মানুষের তৈরি দুটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী মহাকাশযান। আর সেই সাথে খুলতে শুরু করবে সৌরজগতের সবচেয়ে কম জানা গ্রহগুলোর একটির অজানা ইতিহাস।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।