মহাকাশে ধান গবেষণা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধানের গুরুত্ব অপরিসীম। হাজার হাজার বছর ধরে এই শস্য পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে আসছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সম্প্রতি ধান পৌঁছে গেছে মহাকাশেও। চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে এখন ধান নিয়ে একটি অভিনব গবেষণা চলছে। অবশ্য এই গবেষণার লক্ষ্য মহাকাশচারীদের খাবারের ব্যবস্থা করা নয়, বরং ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গলে মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার পথ খুঁজে বের করা।
পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে
মানুষের মহাকাশযাত্রার ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। মাত্র কয়েক দশক আগে মানুষ প্রথম চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিল। আজকের মানুষ স্পেস স্টেশনে কয়েক মাস ধরে মহাকাশে অবস্থান করতে পারছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য আরও বড়। তাঁরা চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করতে চান। একদিন হয়তো মঙ্গল গ্রহেও মানুষের বসতি গড়ে উঠবে।
তখন পৃথিবী থেকে প্রতিটি খাদ্যদ্রব্য মহাকাশযানে করে বহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠবে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন থেকেই মহাকাশে খাদ্য উৎপাদনের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। আর সেই গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে ধান।
ধানকে বেছে নেওয়া হলো কেন?
ধানকে বেছে নেওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। ধানে প্রচুর শর্করা রয়েছে, তুলনামূলকভাবে অল্প জায়গায় এর চাষ করা যায় এবং এর জীবনচক্রও বেশ ছোট।
চীন অবশ্য শুধু ধান নিয়েই মহাকাশে গবেষণা করছে না। গম, আলু, তুলা এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে মানুষের খাদ্যতালিকায় ধানের গুরুত্বের কারণেই এই গবেষণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শূন্য মাধ্যাকর্ষণের চ্যালেঞ্জ
মহাকাশে ধান চাষ করা মোটেই সহজ কাজ নয়। পৃথিবীতে উদ্ভিদের শিকড় নিচের দিকে বাড়ে, আর এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। কিন্তু মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব অত্যন্ত কম। ফলে সেখানে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাব। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র আমাদের এই ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। কিন্তু মহাকাশে সেই সুরক্ষা নেই। তাই বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখছেন, এই পরিবেশে ধানের শিকড়, কান্ড, পাতা এবং ফুলের বৃদ্ধি ঠিক কীভাবে ঘটে।
বীজ থেকে আবার বীজ
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ধানের সম্পূর্ণ জীবনচক্র পর্যবেক্ষণ করা। অর্থাৎ, একটি বীজ থেকে চারা গজানো, সেই চারা থেকে পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হওয়া, তারপর ফুল ফোটা এবং শস্য উৎপন্ন হওয়া।
কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জটি আরও বড়। বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, মহাকাশে জন্ম নেওয়া ধানের বীজ থেকে আবার নতুন ধানগাছ জন্মানো সম্ভব কি না।
ইতিমধ্যেই প্রথম ধাপের পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। ধানের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে, গাছ বেড়ে উঠেছে এবং শস্যও উৎপন্ন হয়েছে। এখন সেই শস্য থেকে পাওয়া বীজ ব্যবহার করে দ্বিতীয় প্রজন্মের ধানগাছ উৎপাদনের কাজ চলছে।
এই পরীক্ষা সফল হলে মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহাকাশে জন্ম নেওয়া ধানের বীজ থেকেই নতুন ধানের জন্ম হবে।
চাঁদ ও মঙ্গলের ভবিষ্যৎ কৃষি
এই গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়। উদ্ভিদ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন উৎপন্ন করে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের মহাকাশ ঘাঁটিতে উদ্ভিদ একই সঙ্গে খাদ্য ও অক্সিজেনের উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।
একসময় মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল, তারপর মানুষ আকাশ জয় করেছিল। এখন শুরু হয়েছে মহাকাশ জয়ের নতুন অধ্যায়। আর সেই অভিযানে মানুষের অন্যতম সঙ্গী হয়ে উঠেছে আমাদের চিরচেনা ধানগাছ।
কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ধানকে কেন্দ্র করে। কয়েক শতাব্দী পরে হয়তো মহাকাশের নতুন সভ্যতার ভিত্তিও গড়ে উঠবে সেই ধানকে ঘিরেই। তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনের ছোট্ট পরীক্ষাগারে সেই ভবিষ্যতেরই বীজ বপন করা হচ্ছে।
