আকাশের ওপারে
প্রাচীন যুগের মানুষ যখন রাতের আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তখন হয়তো তার মনে একই সঙ্গে বিস্ময় আর কৌতূহলের জন্ম হয়েছিল। অসংখ্য নক্ষত্রের ভিড়ে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে সে প্রশ্ন করেছিল, আকাশের ওপারে কী আছে? অন্য কোথাও কী পৃথিবীর মতো জগৎ রয়েছে? সেখানে কি প্রাণের অস্তিত্ব আছে? আর যদি থেকেও থাকে, তাহলে তারা কি কখনো পৃথিবীতে এসেছিল?
এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।
• মহাবিশ্বে আমরা কি একা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছে অসংখ্য পুরাণ, কিংবদন্তি এবং লোককথা। আকাশ থেকে নেমে আসা দেবতা, রহস্যময় আলোর গোলক কিংবা অদ্ভুত উড়ন্ত যানের গল্প পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতার মধ্যেই ছড়িয়ে আছে।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিষয়টি আর কেবল কল্পকাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবকিছু মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। যে প্রশ্ন একসময় আগুনের পাশে বসে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছিল, সেটিই আজ পৌঁছে গেছে আধুনিক গবেষণাগারে।
• আকাশ থেকে কারা এসেছিল?
মিশরীয়দের দেবতা, সুমেরীয়দের আনুনাকি, গ্রিক পুরাণের অলিম্পাসের দেব-দেবীরা সব ক্ষেত্রেই একটি আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁদের প্রায় সবাই আকাশ থেকে নেমে এসেছেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু কেন?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের প্রাচীন ইতিহাসের মধ্যেই। মানুষের পূর্বপুরুষদের কাছে আকাশ ছিল এক রহস্যময় জগৎ। সূর্য, চাঁদ, তারা, ধূমকেতু, বজ্রপাত কিংবা বৃষ্টি সবকিছুর উৎসই ছিল আকাশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা আকাশকে অতিপ্রাকৃত শক্তির আবাসস্থল বলে মনে করেছিল।
• একটি বিতর্কিত ধারণার জন্ম
১৯৬৮ সালে সুইস লেখক এরিখ ফন দানিকেন একটি সাহসী কিন্তু বিতর্কিত ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, প্রাচীন যুগের দেবতারা আসলে দেবতা ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত উন্নত ভিনগ্রহী প্রাণী।
মানুষ তাঁদের প্রযুক্তি বুঝতে পারেনি। তাই তাঁদের দেবতা বলে মনে করেছিল। ধারণাটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। এই তত্ত্বের সমর্থকেরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতার পুরাণে আকাশ থেকে আগত সত্তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পিরামিড, স্টোনহেঞ্জ, নাজকা রেখা কিংবা মায়া সভ্যতার কিছু স্থাপনা তাদের সময়ের তুলনায় অত্যন্ত উন্নত বলে মনে হয়। আবার প্রাচীন কিছু চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যে এমন কিছু বস্তুর দেখা মেলে, যেগুলো আধুনিক মানুষের কাছে মহাকাশযানের মতো মনে হতে পারে।
তবে এখানেই একটি বড় প্রশ্ন রয়ে যায়। এসব অনুমানভিত্তিক ধারণার পক্ষে এখনো পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
• সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা
১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর রসওয়েলের কাছে একটি অদ্ভুত বস্তু ভূপাতিত হয়েছিল। অনেকেই দাবি করেছিলেন, সেটি ভিনগ্রহীদের কোনো মহাকাশযান বা ইউএফও। পরে মার্কিন সরকার জানায়, সেটি ছিল একটি গোপন পরীক্ষামূলক সামরিক বেলুন। তবে সরকারি ভাষ্যের সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে গরমিল ছিল।
এর বহু বছর পরে, ২০০৪ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর কয়েকজন পাইলট আরেকটি রহস্যময় বস্তুর মুখোমুখি হন। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, বস্তুটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অসাধারণ দ্রুততায় স্থান পরিবর্তন করছিল। ঘটনাটি আজও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
• ইউএফও নাকি ইউএপি?
অনেকেই মনে করেন, ইউএফও মানেই ভিনগ্রহীদের মহাকাশযান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দুটি বিষয় এক নয়। ইউএফও (UFO) শব্দটির অর্থ হলো, আনআইডেন্টিফাইড ফ্লাইং অবজেক্ট। অর্থাৎ এমন কোনো উড়ন্ত বস্তু, যার পরিচয় জানা যায়নি।
অন্যদিকে, ইউএপি (UAP) বলতে বোঝায় আনআইডেন্টিফাইড অ্যানোম্যালাস ফেনোমেনা। অর্থাৎ এমন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা, যার ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা জানা না গেলেই সেটি ভিনগ্রহীদের উপস্থিতির প্রমাণ হয়ে যায় না। তাই বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা ইউএপি বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
• রহস্যের পেছনে বিজ্ঞান
একসময় আকাশে কোনো অদ্ভুত আলো দেখা গেলেই মানুষ সেটিকে অলৌকিক ঘটনা বলে মনে করত। কিন্তু আজ বিজ্ঞানীরা ভিন্ন পথে হাঁটছেন। রেডার, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, স্যাটেলাইট, দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের সেন্সরের সাহায্যে তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। তারপর শুরু হচ্ছে বিশ্লেষণ।
অজানা বস্তুটির গতি কত ছিল? সেটি কত দ্রুত দিক পরিবর্তন করেছিল? সেটি থেকে কী ধরনের বিকিরণ বের হচ্ছিল? তার তাপমাত্রা কত ছিল? রাডারে সেটির প্রতিফলন কেমন ছিল? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করছে পদার্থবিজ্ঞান।
• মাঠে নেমেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
তবে সমস্যাও কম নয়। প্রতিদিন আকাশে অসংখ্য বিমান উড়ছে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে হাজার হাজার উপগ্রহ। কোটি কোটি পাখি আকাশে বিচরণ করছে। আবার প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে অসংখ্য উল্কাপিণ্ড।
এই বিপুল তথ্যের ভিড়ে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা খুঁজে বের করা সহজ নয়। সেখানেই কাজে লাগছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। লক্ষ লক্ষ ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বলতে পারে, কোনো বস্তু পাখি, ড্রোন, বিমান, উপগ্রহ নাকি সম্পূর্ণ অন্য কিছু।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যালিলিও প্রকল্প ঠিক এই কাজটিই করছে। বিশেষ ক্যামেরা, শক্তিশালী কম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা আকাশের অজানা ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন।
• বিজ্ঞান থেমে নেই
বিজ্ঞান সব প্রশ্নের উত্তর এখনো দিতে পারেনি। কিন্তু বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি কখনো থেমে থাকে না। একসময় মানুষ মনে করত, বজ্রপাত দেবতাদের ক্রোধের প্রকাশ। ধূমকেতুকে মনে করা হতো অশুভ সংকেত। আজ আমরা জানি, এসব ঘটনার পেছনেও রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
তাই বিজ্ঞানীরা কোনো কিছুকে অন্ধভাবে গ্রহণও করেন না, আবার অযথা প্রত্যাখ্যানও করেন না। তাঁরা প্রমাণ খোঁজেন, তথ্য বিশ্লেষণ করেন এবং পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
• শেষ কথা
এই বিশাল মহাবিশ্বে হয়তো আমরা একা নই। আবার এটাও হতে পারে, পৃথিবীতে বুদ্ধিমান প্রাণের উন্মেষ একটি বিরল ব্যতিক্রম। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমরা এখনো জানি না।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। যত দিন মানুষ থাকবে, তত দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নটিও থাকবে। কারণ আমরা পৃথিবীর সন্তান হলেও আমাদের অপার কৌতূহলের কোনো সীমানা নেই।
