বদলে যাচ্ছে মানচিত্র
ছোটবেলা থেকে পৃথিবীর যে মানচিত্র দেখে আমরা বড় হয়েছি, সেখানে একটা বড় বিভ্রম লুকিয়ে আছে। বিশ্বমানচিত্রে আফ্রিকাকে যতটা ছোট বলে মনে হয়, বাস্তবে মহাদেশটি তার চেয়ে অনেক বিশাল। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, রাশিয়া আর উত্তর ইউরোপকে দেখায় অনেক বড়।
কেন এমন হয়? মারকেটর প্রজেকশনের ভূমিকা
পৃথিবী গোল, কিন্তু বিশ্বমানচিত্র সমতল। গোল পৃথিবীর পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে ছড়িয়ে দিতে গেলে কোথাও না কোথাও বিকৃতি ঘটবেই। আমাদের পরিচিত বিশ্বমানচিত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতির নাম মারকেটর প্রজেকশন। মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর ১৫৬৯ সালে এটি তৈরি করেছিলেন মূলত নাবিকদের সুবিধার জন্য। এতে দিক ঠিক রাখা সহজ হয়। সমুদ্রযাত্রার জন্য এটি ছিল অসাধারণ এক উদ্ভাবন।
মেরু অঞ্চলে আকারের বিকৃতি
মারকেটর মানচিত্রের আসল সমস্যা দেখা দেয় মেরুর দিকে। বিষুবরেখা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ভূখণ্ডের আকার তত বেশি বড় হয়ে ওঠে। তাই গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও রাশিয়াকে বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। অন্যদিকে আফ্রিকার বেশির ভাগ অংশ বিষুব রেখার কাছাকাছি থাকায় সেখানে এই বিকৃতি অনেক কম।
ফলে আমাদের চোখে তৈরি হয় এক আশ্চর্য বিভ্রম। বিশ্বমানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আকারের মনে হতে পারে। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়! আফ্রিকার আয়তন প্রায় ৩ কোটি বর্গকিলোমিটার, আর গ্রিনল্যান্ডের আয়তন মাত্র ২২ লাখের কাছাকাছি।
‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ ও জাতিসংঘের উদ্যোগ
এই বিভ্রান্তি দূর করতে আফ্রিকান ইউনিয়ন “ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন” ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই বিশ্বমানচিত্রের বিশেষত্ব হলো, দেশ ও মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তন ঠিক রাখা।
বিষয়টি এখন জাতিসংঘেও পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এমন বিশ্বমানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় থাকে। “কারেক্ট দ্যা ম্যাপ” নামের এই প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। ভোটদানে বিরত থেকেছে ৬টি দেশ এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র একটি দেশ – যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন মানচিত্র, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
এর অর্থ এই নয় যে মারকেটর মানচিত্র ভুল কিংবা সেটি বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নৌচলাচল ও দিক নির্ণয়ের মতো কাজে এটি এখনও অত্যন্ত কার্যকর। সমস্যা হয় তখনই, যখন এই মানচিত্র দেখে আমরা দেশ অথবা মহাদেশের আয়তন তুলনা করতে যাই।
আসলে গোল পৃথিবীকে সমতল কাগজে শতভাগ নিখুঁতভাবে আঁকা সম্ভব নয়। কোনো মানচিত্র আয়তন ঠিক রাখে, কোনোটি আকৃতি, কোনোটি আবার দিক অথবা দূরত্বকে অগ্রাধিকার দেয়। নতুন মানচিত্রে পৃথিবী বদলানো হচ্ছে না। বরং বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে পৃথিবীকে দেখার আমাদের পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি। আর নতুন মানচিত্রে তাকালে প্রথম চমকটাই হবে – আফ্রিকা মহাদেশ আসলে অনেক বড়।
