মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাপ্রকৃতি ও পরিবেশহিমালয়ে ধ্বংসের স্রোত

হিমালয়ে ধ্বংসের স্রোত

২৮ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ২৭ 💬 ০
হিমালয়ে ধ্বংসের স্রোত
একটি পর্বতে হঠাৎ করে বরফ আর পাথরের ধ্বস হলো।  কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেল নদীর প্রবাহ। তারপর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, বরফ, পাথর আর কাদা একসঙ্গে ছুটে গেল নিচের দিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লন্ডভন্ড হয়ে বদলে গেল পুরো একটি জনপদের চেহারা।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে এমন একটি ঘটনাই কাজ করে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নেপালের রাসুয়া জেলা থেকে তিব্বতের গ্যিরোং পর্যন্ত বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল এর আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ।

হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস

বুধবার সকালে তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ ঢল নেমে আসে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোটে কোশি নদীর দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, এটা সাধারণ বন্যার পানির মতো ছিল না। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে ভরা বিশাল একটি স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসছে। এর সামনে যা যা পড়েছে, তার সব কিছুই ভেসে গেছে। বিভিন্ন ভিডিওতে এই ধ্বংসলীলার ভয়ংকর তান্ডব দেখা গেছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, সেতু, গাড়ি এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে এই পানি ত্রিশূলী নদীর দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

কোথা থেকে এলো এত পানি?

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ বলছে, তিব্বতের উঁচু পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে বরফ ও পাথরের ধস নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এই ice-rock avalanche ল্হেন্দে খোলা নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দিয়ে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে জমে থাকা বিপুল পানি, বরফ, পাথর ও কাদা একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে আসে।
নদীর ওপর এভাবে হঠাৎ পাথর, মাটি ও বরফ জমে গেলে সেটি অনেকটা প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করে। পেছনে জমতে থাকে নদীর পানি। সমস্যা হলো, মানুষের তৈরি বাঁধের মতো এই বাঁধ শক্ত এবং পাকাপোক্ত নয়। একসময় পানির চাপ বেড়ে গেলে বাঁধটি ভেঙে যায়। তখন আটকে থাকা বিপুল পানি একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে পাথর, কাদা, বরফ, মাটি অর্থাৎ সামনে যা যা পায় তার সবকিছু।

এত ভয়ংকর কেন?

পাহাড়ি নদীর আকস্মিক বন্যা সমতলের বন্যার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সমতলে পানি সাধারণত তুলনামূলক ধীরে বাড়ে। কিন্তু হিমালয়ের খাড়া উপত্যকায় উচ্চতার পার্থক্য অনেক বেশি। ফলে ওপর থেকে ছেড়ে দেওয়া বিপুল পানির মহাকর্ষীয় বিভবশক্তি দ্রুত গতিশক্তিতে রূপ নেয়।
তার সঙ্গে যদি বড় বড় পাথর ও কাদামাটি মিশে যায়, তখন এটি আর শুধু পানির স্রোত থাকে না। তৈরি হয় অত্যন্ত ঘন ও ভারী ডেব্রি ফ্লো। সেই স্রোত ভবন ভাঙতে পারে, সেতু উপড়ে ফেলতে পারে এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রাস্তাঘাট নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। ২৬ আগস্টের ভিডিওগুলোতে ঠিক এই ধরনের ধ্বংসাত্মক স্রোতই দেখা গেছে।

শত শত মানুষ নিখোঁজ

এই বিপর্যয়ের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ৪৯৪ জন মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তবে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশি পর্যটক এবং তীর্থযাত্রী রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের তিব্বত অংশের গ্যিরোং সীমান্ত এলাকাতেও বড় ভূমিধস হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকাজ চলছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে সময় লাগছে।

ঝুঁকিপূর্ণ হিমালয়

হিমালয় ভূতাত্ত্বিকভাবে একটি সক্রিয় পর্বতমালা। ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট এখনো ইউরেশীয় প্লেটের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। ফলে এখানে ভূমিকম্প ও ভূমিধ্বসের ঝুঁকি এমনিতেই বেশি। তার ওপর রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চাপ। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে হিমবাহ গলছে এবং অনেক জায়গায় বরফ ও জমাট মাটির স্থিতিশীলতা কমছে। হিমবাহের পাশে নতুন নতুন হ্রদও তৈরি হচ্ছে। ফলে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF, বরফ-পাথরের ধ্বস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন।
এর আগেও এই অঞ্চল সতর্কবার্তা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নেপালের রাসুয়াগাধিতে একটি হিমবাহ-সংশ্লিষ্ট আকস্মিক বন্যা হয়েছিল, যেটা নেপাল ও চীনের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

বিপদ এখনো কাটেনি

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বর্তমান বিপর্যয়ের পরও উজানে নতুন করে পানি আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বাধা ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা নামতে পারে। এ কারণে নদীর নিচু এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হিমালয়ের এই ঘটনা আমাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিল পাহাড়ের ওপর ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই শত শত কিলোমিটার দূরে নিচের জনপদের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বরফ, পাথর, পানি আর মহাকর্ষ প্রকৃতির এই চারটি উপাদান যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন একটি শান্ত পাহাড়ি নদীও মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হতে পারে ভয়াবহ ধ্বংসের স্রোতে।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।