মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাজীবনের বিজ্ঞানবুক রিভিউ: হোয়াই উই ডাই?

বুক রিভিউ: হোয়াই উই ডাই?

২৬ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৬ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৩৪ 💬 ০
বুক রিভিউ: হোয়াই উই ডাই?
মানুষ বুড়ো হয়। একসময় শরীরের কলকবজা ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করে। তারপর মানুষ মারা যায়। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন আছে, বিজ্ঞান কি কোনো দিন এই প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারবে?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ অমরত্বের স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু এখন সেই পুরোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে আধুনিক জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে।
নোবেলজয়ী জীববিজ্ঞানী ভেনকি রামাকৃষ্ণনের লেখা বই, Why We Die: The New Science of Aging and the Quest for Immortality মূলত সেই অনুসন্ধানেরই গল্প। বার্ধক্য ও মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন অণু, কোষ, জিন এবং বিবর্তনের চোখ দিয়ে। আসুন চমৎকার এই বইটাতে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

মৃত্যু কি আমাদের জিনে লেখা?

রামাকৃষ্ণনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, আমরা মরার জন্য প্রোগ্রামড নই। অর্থাৎ মানুষের শরীরে এমন কোনো নির্দিষ্ট জেনেটিক ঘড়ি বসানো নেই, যেটা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে শরীরকে বলে, এবার বন্ধ হয়ে যাও।
আসলে সমস্যাটা ঘটে অন্যভাবে।
বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তেই আমাদের শরীরের ভেতরে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে। কোষ বিভাজিত হচ্ছে, ডিএনএ কপি হচ্ছে, প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, পুরোনো প্রোটিন ভেঙে নতুন প্রোটিন তৈরি হচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কখনোই শতভাগ নিখুঁত নয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমতে থাকে ছোট ছোট ক্ষয়ক্ষতি।
ডিএনএতে ক্ষত তৈরি হয়।প্রোটিনের গঠন বিগড়ে যায়। মাইটোকন্ড্রিয়ার কর্মক্ষমতা কমে। কোষের বর্জ্য পরিষ্কার করার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আগের মতো শক্তিশালী থাকে না।
তরুণ বয়সে শরীরের মেরামত ব্যবস্থা এসব ক্ষয়ক্ষতি বেশ ভালোভাবেই সামলে নিতে পারে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি জমার গতি আর ক্ষয় মেরামতের ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। আমরা যাকে বার্ধক্য বলি, তার অনেকটাই এই দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষতির ফল।

কিন্তু সবাই কি বুড়ো হয়?

এখানেই প্রকৃতি আমাদের সামনে এক মজার ধাঁধা হাজির করেছে।
হাইড্রা নামে অতি ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুর ঝুঁকি মানুষের মতো বাড়তে দেখা যায় না। এরা শরীরে ছোট কুঁড়ি তৈরি করে নতুন প্রজন্ম বানিয়ে ফেলে।
একইভাবে তথাকথিত ‘ইমমর্টাল জেলিফিশ’ (Turritopsis dohrnii) বিশেষ পরিস্থিতিতে তার পূর্ণবয়স্ক অবস্থা থেকে আবার আগের জীবনচক্রে ফিরে যেতে পারে।
এসব প্রাণীকে তাই অনেক সময় ‘জৈবিকভাবে অমর’ বলা হয়।
তার মানে অবশ্য এই নয় যে এদের মৃত্যু হয় না। এরা শিকারির পেটে যেতে পারে, রোগ হতে পারে, আবার খাবারের অভাবে মরতে পারে। কিন্তু মানুষের মতো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবধারিতভাবে শরীর ভেঙে পড়ার প্রবণতা এদের ক্ষেত্রে অনেক কম বা ভিন্ন। এই ব্যতিক্রমগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় – বার্ধক্য জীবজগতের সর্বজনীন ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম নাও হতে পারে।

কোষেরও আছে সীমা

মানুষের কোষ অনন্তকাল ধরে বিভাজিত হতে পারে না।
ষাটের দশকে বিজ্ঞানী লিওনার্ড হেফ্লিক দেখিয়েছিলেন, পরীক্ষাগারে মানবদেহের স্বাভাবিক কিছু কোষ নির্দিষ্টসংখ্যকবার বিভাজিত হওয়ার পর আর বিভাজিত হয় না। এই ঘটনাই পরে পরিচিত হয় “হেফ্লিক লিমিট” নামে।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা টেলোমিয়ার। জুতার ফিতার মাথায় যেমন প্লাস্টিকের আবরণ ফিতাটিকে খুলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে, টেলোমিয়ারও অনেকটা তেমনি ক্রোমোজোমের প্রান্তকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় টেলোমিয়ার কিছুটা ছোট হতে থাকে। একসময় সেটি অতিরিক্ত ছোট হয়ে গেলে কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন কোষকে বলা হয়, “সেনেসেন্ট সেল” – সহজ ভাষায়, বুড়িয়ে যাওয়া কোষ।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। হেফ্লিক লিমিট বা টেলোমিয়ার ছোট হয়ে যাওয়াই পুরো শরীরের বার্ধক্যের একমাত্র কারণ নয়। বার্ধক্য অনেকগুলো জৈবিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল।

বিবর্তনের লক্ষ্য

এর উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে বিবর্তনের কাছে। বিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য কোনো প্রাণীকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা নয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিচারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি জীব যেন যথেষ্ট সময় বেঁচে থেকে সফলভাবে তার জিন পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিতে পারে।
জীব কোষের কাছে সম্পদের পরিমাণ সীমিত। সেই সম্পদ বৃদ্ধি, প্রজনন, রোগ প্রতিরোধ এবং শরীর মেরামত – সবখানেই ভাগ করে দিতে হয়। ফলে শরীরকে অনন্তকাল নিখুঁত অবস্থায় রাখার জন্য  বিপুল বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু বিবর্তনের কাছে তার তেমন কোনো বাড়তি সুবিধা নেই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বার্ধক্যকে বলা যায় বিবর্তনের এক অনিবার্য পরিণতি।
প্রজননের সময় পর্যন্ত শরীরকে সচল রাখার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপ প্রবল। তার পর সেই চাপ ক্রমেই দুর্বল হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বার্ধক্যের গতি কি কমানো সম্ভব?

এটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
পরীক্ষাগারে ইঁদুর, মাছি, কৃমি ও অন্যান্য প্রাণীর জীবনকাল বাড়ানোর বেশ কিছু উপায় বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো একটি হলো,  ক্যালোরি রেস্ট্রিকশন। অপুষ্টি সৃষ্টি না করে খাবারের ক্যালোরি কমিয়ে দেওয়া। বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে এতে জীবনকাল ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় বাড়তে দেখা গেছে।
বার্ধক্য নিয়ে গবেষণার আরেকটি বহুল আলোচিত উপাদান হলো, র‍্যাপামাইসিন। এটি কোষের এমটর (mTOR) নামের ‘বৃদ্ধির সুইচ’ এর কার্যক্রম কমিয়ে দেয়। ফলে কোষ বৃদ্ধির বদলে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিষ্কার ও মেরামতের কাজে বেশি মনোযোগ দেয়। ইঁদুরের ওপর বহু পরীক্ষায় র‍্যাপামাইসিন জীবনকাল বাড়াতে পেরেছে।
এছাড়াও আলোচনায় রয়েছে ডায়াবেটিসের বহুল ব্যবহৃত ওষুধ মেটফর্মিনও।
কিন্তু এখানেই রামাকৃষ্ণন বেশ সতর্ক। ইঁদুরের জীবন বাড়ানো আর মানুষের জীবন বাড়ানো এক কথা নয়। কোনো ওষুধ প্রাণীর ক্ষেত্রে কাজ করেছে বলেই সুস্থ মানুষের বার্ধক্য ঠেকাতে সেটি নিরাপদ ও কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রমাণ এখনো নেই।

অমরত্বের ব্যবসা

বার্ধক্য নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিশাল এক লাভজনক ‘লঞ্জেভিটি’ বা আয়ু বৃদ্ধির শিল্প। সিলিকন ভ্যালির ধনকুবের থেকে শুরু করে বিভিন্ন বায়োটেক কোম্পানি পর্যন্ত বিপুল অর্থ ঢালছে মানুষের আয়ু বাড়ানোর গবেষণায়। কেউ বুড়ো কোষকে তরুণ করার চেষ্টা করছে, আবার কেউ সেনেসেন্ট কোষ সরানোর, কেউ জিন সম্পাদনার, আবার কেউ শরীরের জৈবিক ঘড়িকে পেছনে ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
রামাকৃষ্ণন এই জায়গায় যথেষ্ট সংশয়ী। বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর বাজারে বিক্রি হওয়া ‘অ্যান্টি-এজিং’ প্রতিশ্রুতির মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, সেটি তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন।
আর এখানেই উঠে আসে আরেকটি বড় প্রশ্ন। ধরা যাক, বিজ্ঞান সত্যি সত্যিই মানুষের সুস্থ জীবন আরও ৩০, ৫০ কিংবা ১০০ বছর বাড়িয়ে দিতে পারল। সেই প্রযুক্তি যদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়, তাহলে কারা সেটি পাবে? অতিদীর্ঘ জীবন যদি শুধু ধনীদের নাগালের মধ্যে থাকে, তাহলে মানুষের আয়ুর ব্যবধানই কি ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সামাজিক বৈষম্যে পরিণত হবে?

বিজ্ঞানের লক্ষ্য অমরত্ব নয়

সম্ভবত বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এখানেই। বিজ্ঞানের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য এখন মানুষকে অমর করা নয়। বরং লক্ষ্য হলো,  হেলথস্প্যান বাড়ানো। অর্থাৎ জীবনের যে সময়টুকু আমরা সুস্থ, কর্মক্ষম ও স্বাধীনভাবে কাটাতে পারি, সেটি দীর্ঘ করা।
মানুষের গড় আয়ু গত শতকে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। কিন্তু মানুষের সর্বোচ্চ প্রমাণিত আয়ু এখনো প্রায় ১২২ বছরেই আটকে আছে। তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কত বছর বাঁচলাম’ সেটা নয়, বরং কত বছর ভালোভাবে বাঁচলাম।

মৃত্যুকে বুঝতে শেখা

Why We Die- বইটি অমর হওয়ার কোনো রেসিপি নয়। বরং বইটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন মানুষের শরীর বুড়ো হয়, কেন একসময় তার মেরামত ব্যবস্থা আর ক্ষয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না এবং বিজ্ঞান সেই প্রক্রিয়ায় কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারে।
হয়তো কোনো দিন আমরা বার্ধক্যের গতি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারব। হয়তো মানুষের সুস্থ জীবন আরও দীর্ঘ হবে। কিন্তু অমরত্ব এখনো বিজ্ঞানের চেয়ে কল্পবিজ্ঞানের কাছাকাছি।
আর আপাতত দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের জন্য বিজ্ঞানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শগুলো আশ্চর্য রকমের পুরোনো – পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম। হাজার কোটি ডলারের লঞ্জেভিটি গবেষণার যুগেও সেই পুরোনো ধারণাগুলোকে এখনো কোনো ‘অমরত্বের ওষুধ’ হারাতে পারেনি।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।