মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাজীবনের বিজ্ঞানভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের বিজ্ঞানযাত্রা

ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের বিজ্ঞানযাত্রা

২০ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৭১ 💬 ০
ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের বিজ্ঞানযাত্রা
প্রথমে পড়াশোনা করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। পরে পিএইচডিও করেছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে। অথচ শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পেলেন রসায়নে, জীবকোষের এক অসাধারণ আণবিক যন্ত্রের গঠন উন্মোচন করে। বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের জীবন যেন প্রচলিত পথ ছেড়ে কৌতূহলকে অনুসরণ এক অসাধারণ গল্প।

পদার্থবিজ্ঞান থেকে জীববিজ্ঞানে

ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের জন্ম ১৯৫২ সালে ভারতের তামিলনাড়ুর চিদাম্বরমে। মা-বাবা দুজনেই ছিলেন বিজ্ঞানী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, তবে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে কোনো বিষয়ের গভীরে ঢুকে সেটি ভালোভাবে বোঝার প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি ।
বরোদার মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে মাত্র উনিশ বছর বয়সে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন।
কিন্তু এরপরই নিলেন এক অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত।পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত জগৎ ছেড়ে তিনি ঝুঁকে পড়লেন জীববিজ্ঞানের দিকে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সানডিয়াগোতে নতুন করে জীববিজ্ঞান শেখা শুরু করলেন। এক অর্থে তাঁকে আবার ছাত্রজীবনে ফিরে যেতে হলো।
জেনেটিক্স, বায়োকেমিস্ট্রি আর মলিকুলার বায়োলজির ভাষা তখন তাঁর কাছে অনেকটাই নতুন। কিন্তু পদার্থবিদ হিসেবে গড়ে ওঠা বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিই পরে তাঁকে জীববিজ্ঞানের এক অত্যন্ত জটিল সমস্যার গভীরে ঢুকতে সাহায্য করেছিল।

প্রোটিন তৈরির কারখানা

তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে রাইবোসোম। জীবকোষের ভেতরে রাইবোসোমকে বলা যায় প্রোটিন তৈরির কারখানা। ডিএনএতে সংরক্ষিত জিনগত নির্দেশনা প্রথমে আসে মেসেঞ্জার আরএনএ-তে (mRNA)। রাইবোসোম সেই বার্তা পড়ে নির্দিষ্ট ক্রমে অ্যামিনো অ্যাসিড জুড়ে তৈরি করে প্রোটিন।আর এই প্রোটিন ছাড়া জীবনের প্রায় কোনো কাজই চলে না।
কিন্তু সমস্যা হলো, রাইবোসোমের গঠন ভীষণ জটিল। এটি শুধু একটি অণু নয়; রাইবোসোমাল আরএনএ ও বহু প্রোটিন মিলে তৈরি বিশাল এক আণবিক যন্ত্র। এর প্রতিটি অংশ কীভাবে সাজানো এবং কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে- সেটি পরমাণুর কাছাকাছি সূক্ষ্মতায় দেখা ছিল বিজ্ঞানীদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ।

অসম্ভবকে দৃশ্যমান করা

এই চ্যালেঞ্জটাই গ্রহণ করেছিলেন রামাকৃষ্ণন। এক্সরে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ব্যাকটেরিয়ার রাইবোসোমের ছোট সাবইউনিটের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ত্রিমাত্রিক গঠন নির্ণয় করেন। একই সময়ে বিশ্বের আরও কয়েকটি গবেষক দল রাইবোসোমের বিভিন্ন অংশের গঠন নিয়ে কাজ করছিলেন। এই গবেষণা বিজ্ঞানীদের সামনে যেন কোষের ভেতরের একটি যন্ত্রের ঢাকনা খুলে দিল। বোঝা গেল, জিনের বার্তা রাইবোসোম কীভাবে পড়ে, সেই নির্দেশনা থেকে কীভাবে প্রোটিন তৈরি হয় এবং এই জটিল প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে কোন অংশ কী ভূমিকা রাখে।
এর ব্যবহারিক গুরুত্বও ছিল বিশাল। অনেক অ্যান্টিবায়োটিক কোষকে না মেরে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে, কারণ সেগুলো ব্যাকটেরিয়ার রাইবোসোমের নির্দিষ্ট অংশে গিয়ে আটকে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন তৈরির যন্ত্র থেমে যায়। রাইবোসোমের ত্রিমাত্রিক গঠন জানার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ঠিক কোথায় এবং কীভাবে কাজ করে, সেটিও অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 রসায়নে নোবেল পুরস্কার

রাইবোসোমের গঠন ও কার্যপ্রণালি নিয়ে এই যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি আসে ২০০৯ সালে। ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণন, আদা ইয়োনাথ এবং টমাস স্টেইৎজ যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান – “রাইবোসোমের গঠন ও কার্যপ্রণালি নিয়ে গবেষণার জন্য।”
যে মানুষটির একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়েছিল পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে, তিনিই শেষ পর্যন্ত জীববিজ্ঞানের এক মৌলিক রহস্য উন্মোচন করে পেলেন রসায়নের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।তাঁর বিজ্ঞানযাত্রার সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই।

রয়্যাল সোসাইটির নেতৃত্বে

নোবেল পুরস্কারের পরও তাঁর যাত্রা থেমে থাকেনি। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটেনের ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।
যে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের সঙ্গে আইজ্যাক নিউটন, চার্লস ডারউইন, মাইকেল ফ্যারাডে, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের মতো বিজ্ঞানীদের নাম জড়িয়ে আছে, সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে একজন  অভিবাসী বিজ্ঞানীর উঠে আসা ছিল নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

বিজ্ঞানের নেপথ্যের গল্প

রামাকৃষ্ণনের আত্মজীবনীমূলক বই, “Gene Machine: The Race to Decipher the Secrets of the Ribosome”  তাঁর বিজ্ঞানযাত্রার আরেকটি আকর্ষণীয় দিক তুলে ধরে।
এটি শুধু রাইবোসোম আবিষ্কারের ইতিহাস নয়। বইটিতে আছে গবেষণাগারের প্রতিযোগিতা, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা, হতাশা, বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের তীব্র আকাঙ্ক্ষার গল্প।
বইটি পড়লে বোঝা যায়,পাঠ্যবইয়ে বিজ্ঞানকে যতটা গোছানো মনে হয়, বাস্তবে বিজ্ঞান ততটা সরল পথে এগোয় না। সেখানে ভুল হয়, পথ বদলাতে হয়, কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। আবার কখনো একটি ছোট সাফল্যই খুলে দেয় সম্পূর্ণ নতুন একটি দরজা।

সীমানা পেরোনোর বিজ্ঞান

ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের জীবন শুধু একজন নোবেলজয়ীর সাফল্যের গল্প নয়। তাঁর জীবন দেখায়, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে আমরা যে সীমারেখা টেনে রাখি, প্রকৃতিতে সেই দেয়াল আসলে নেই।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ঢুকেছিলেন জীববিজ্ঞানে। সেখানে ব্যবহার করেছেন রসায়ন ও কাঠামোগত জীববিজ্ঞানের পদ্ধতি। আর শেষ পর্যন্ত উন্মোচন করেছেন জীবনের সবচেয়ে মৌলিক প্রক্রিয়াগুলোর একটি – জিনের নির্দেশনা থেকে প্রোটিন তৈরির আণবিক যন্ত্রের গঠন।
সম্ভবত তাঁর বিজ্ঞানযাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। কৌতূহলের কোনো বিভাগ নেই। নতুন কিছু জানার জন্য কখনো কখনো পরিচিত পথ ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা পথে হাঁটতে হয়। আর সেই অচেনা পথই নিয়ে যেতে পারে অসাধারণ কোনো আবিষ্কারের দোরগোড়ায়।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।