প্রজন্মের জন্মকথা
জীবজগতের দিকে তাকালে একটি পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। মানুষ থেকে শুরু করে পাখি, মাছ, কীটপতঙ্গ, এমনকি বহু উদ্ভিদের মধ্যেও রয়েছে নারী ও পুরুষের আলাদা ভূমিকা। নতুন প্রজন্ম তৈরির জন্য সাধারণত দুই বিপরীত লিঙ্গের দরকার হয়। কিন্তু জীবজগতের শুরুতে ব্যাপারটা এমন ছিল না।
একাই যখন যথেষ্ট
পৃথিবীর প্রথম দিককার জীবদের লিঙ্গ বলে কিছু ছিল না। একটি কোষ বড় হয়ে দুটো ভাগ হয়ে গেলেই তৈরি হতো নতুন প্রজন্ম। আজও ব্যাকটেরিয়াসহ অসংখ্য এককোষী জীব এভাবেই বংশবিস্তার করে। তাহলে জীবজগতে নারী ও পুরুষের আবির্ভাব কেন ঘটল? একা বংশবিস্তার করা তো অনেক সহজ কাজ ছিল।
একটু ভাবলে বরং নারী ও পুরুষের মাধ্যমে বংশবিস্তারকে বেশ ঝামেলার ব্যাপার বলে মনে হয়। সঙ্গী খুঁজতে হয়, তাকে আকৃষ্ট করতে হয়, তারপর দুই জীবের জিনগত উপাদান একত্রিত করতে হয়। অনেক প্রাণীকে এর জন্য বিপুল পরিশ্রম ও সময়ও ব্যয় করতে হয়।
অন্যদিকে একক প্রজননে এসবের বালাই নেই। একজন থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন প্রজন্ম। তাহলে প্রকৃতিতে যূগল প্রজননের মত জটিল পথ তৈরি হলো কেন ? এর বড় উত্তর হলো, জিনগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা।
জিনের নতুন মিশ্রণ
যূগল প্রজননের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সন্তানের জিন আসে দুই উৎস থেকে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরির সময়ও ক্রোমোজোমের মধ্যে জিনের উপাদানের অদলবদল ঘটে। ফলে প্রতিটি সন্তান পায় জিনের একটি নতুন মিশ্রণ।
ব্যাপারটিকে অনেকটা একই তাসের প্যাকেট বারবার শাফল করার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তাসগুলো একই, কিন্তু প্রতিবারের শাফলে হাতে আসে নতুন কার্ডের সমন্বয়। জিনের এই বৈচিত্র্যই বিবর্তনের কাঁচামাল হয়ে উঠে।
পরিবেশ বদলে গেলে, নতুন রোগ এলে কিংবা নতুন কোনো প্রতিকূলতা দেখা দিলে একটি বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর অন্তত কিছু সদস্যের টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাদের সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্য আবার পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। এর আরেকটি সুবিধা হলো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষতিকর মিউটেশন জমে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে এটি সাহায্য করতে পারে।
নারী-পুরুষের বিভাজন
প্রজনন ব্যবস্থার শুরুতেই আজকের মতো নারী ও পুরুষ বলে আলাদা ছিল না। জীব বিবর্তনের আদিম যুগে প্রজনন কোষ বা গ্যামেটের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে থাকে। প্রজননের একটি কৌশল ছিল বড়, পুষ্টিসমৃদ্ধ কিন্তু সংখ্যায় কম গ্যামেট তৈরি করা। অন্য কৌশলটি ছিল ছোট, চলনশীল এবং সংখ্যায় অনেক বেশি গ্যামেট তৈরি করা।
বড় গ্যামেট হলো ডিম্বাণুর পূর্বসূরি, আর ছোট গ্যামেট হলো শুক্রাণুর পূর্বসূরি। এখান থেকেই ধীরে ধীরে নারী ও পুরুষের পৃথক প্রজনন ব্যবস্থার বিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ জীব-প্রকৃতি শুরুতেই ঠিক করে দেয়নি যে নারী ও পুরুষ বিভাজিত হয়ে থাকবে। বিবর্তনের দীর্ঘ পথে দুটি ভিন্ন প্রজনন কৌশল থেকে এই লিঙ্গ বিভাজন তৈরি হয়েছে। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু ভিন্ন প্রজনন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
দুই লিঙ্গই সব নয়
জীবজগৎ অবশ্য শুধু নারী আর পুরুষ – এই দুই সরল ভাগে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক উদ্ভিদের ফুলে একই সঙ্গে পুরুষ ও স্ত্রী দুই ধরনের প্রজনন অঙ্গ থাকে। এদের বলা হয় উভলিঙ্গ ফুল। ধান, জবা, সরিষা ও টমেটোর ফুল পরিচিত উদাহরণ।
প্রাণীদের মধ্যেও উভলিঙ্গ জীব রয়েছে। কেঁচো ও অনেক শামুকের একই শরীরে পুরুষ ও স্ত্রী দুই ধরনের প্রজনন ব্যবস্থাই থাকে। তবে উভলিঙ্গ হলেই যে নিজে নিজে প্রজনন করবে, সেটা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রে বংশবিস্তারের জন্য আরেকটি সঙ্গীর প্রয়োজন হয়।
কিছু কিছু প্রাণী আবার জীবনের মাঝপথে লিঙ্গই বদলে ফেলে। কিছু মাছ প্রথমে পুরুষ থাকে, পরে স্ত্রী মাছ হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো প্রজাতিতে ঘটে ঠিক উল্টোটা। অর্থাৎ জীবজগতে লিঙ্গের ব্যবস্থাও এক ছাঁচে তৈরি নয়। এটা পরিবর্তিত হতে পারে।
পুরুষ ছাড়া প্রজন্ম!
প্রজন্মের জন্মের গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ সম্ভবত এখানেই। যূগল প্রজনন জিনগত বৈচিত্র্য তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতি কখনোই একটি মাত্র পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে বসে থাকেনি। বহু জীবের মধ্যে এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে স্ত্রী জীব পুরুষের জিনগত অবদান ছাড়াই সন্তান তৈরি করতে পারে।
প্রাণীদের মধ্যে এর একটি পরিচিত উদাহরণ – পারথেনোজেনেসিস।
এ ক্ষেত্রে অনিষিক্ত ডিম্বাণু থেকেই ভ্রূণের বিকাশ শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় যেমন – এফিড, মৌমাছি; কিছু মাছ, টিকটিকি ও অন্যান্য সরীসৃপের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পারথেনোজেনেসিস দেখা যায়।
মৌমাছির ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণত অনিষিক্ত ডিম থেকে তৈরি হয় পুরুষ মৌমাছি বা ড্রোন, আর নিষিক্ত ডিম থেকে তৈরি হয় স্ত্রী মৌমাছি।
উদ্ভিদের অ্যাপোমিক্সিস
উদ্ভিদের জগতে রয়েছে আরও বিস্ময়কর একটি প্রজনন ব্যবস্থা, যার নাম এপোমিক্সিস। সাধারণত একটি ফুলের ডিম্বাণুর সঙ্গে পরাগরেণু থেকে আসা শুক্রাণুর মিলন ঘটার পর বীজ তৈরি হয়। কিন্তু এপোমিক্সিসে এই মিলন ছাড়াই বীজ তৈরি হতে পারে।
আর এখানেই রয়েছে এপোমিক্সিসের বিশেষ গুরুত্ব। কারণ এভাবে তৈরি উদ্ভিদ হবে মাতৃগাছের হুবহু জিনগত প্রতিলিপি বা ক্লোন। অর্থাৎ কোনো গাছের অত্যন্ত ভালো কোন বৈশিষ্ট্য থাকলে সেটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেকটাই অপরিবর্তিত রাখা সম্ভব। এ কারণেই হাইব্রিড ধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ফসলে “সিন্থেটিক এপোমিক্সিস” ঘটানোর চেষ্টা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই গবেষণা করছেন এবং এক্ষেত্রে তাঁরা কিছুটা সফলও হয়েছেন।
বাড়তি কৌশল
প্রকৃতিতে পুরুষের অংশগ্রহণ ছাড়া বংশবিস্তারের কৌশল শুধু পারথেনোজেনেসিস বা এপোমিক্সিসেই সীমাবদ্ধ নয়। কিছু জীব নিজেকে ভাগ করে বংশবিস্তার করে। হাইড্রার মতো প্রাণী শরীরে ছোট কুঁড়ি তৈরি করে নতুন প্রাণী বানায়। স্টারফিশের মতো কিছু প্রাণীর শরীরের অংশ থেকে আবার সম্পূর্ণ প্রাণী তৈরি হতে পারে। এছাড়াও বহু উদ্ভিদ কাণ্ড, মূল, রানার কিংবা কন্দ, এমনকি পাতা থেকেও নতুন গাছ তৈরি করে। আবার কিছু কিছু জীব প্রয়োজন অনুযায়ী একক ও যূগল – দুই ধরনের প্রজনন ব্যবস্থাই ব্যবহার করতে পারে।
কোন পদ্ধতি ভালো?
এর কোনো সরল উত্তর নেই।
একক প্রজনন দ্রুত, সহজ এবং সঙ্গীর প্রয়োজন নেই। পরিবেশ যদি দীর্ঘদিন একই রকম থাকে এবং কোনো জীব সেখানে খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়, তাহলে নিজের সফল জিনগত নকশাটি হুবহু ছড়িয়ে দেওয়াটাই বেশ লাভজনক।
কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশ কখনো স্থির থাকে না। জলবায়ু বদলায়। নতুন রোগ আসে। পরজীবী বিবর্তিত হয়। খাদ্যের উৎস পাল্টে যায়। এই অনিশ্চিত পৃথিবীতে জিনের নতুন নতুন সমন্বয় তৈরি করার ক্ষমতা যূগল প্রজননকে দিয়েছে টিকে থাকার এক বিরাট সুবিধা।
তাই জীবজগতে আমরা একক ও যূগল- এ দুটি বিপরীত কৌশলকে পাশাপাশি দেখতে পাই। একদিকে নিজের সফল নকশাটিকে কপি করে যাওয়া। অন্যদিকে সেই নকশাটিকে প্রতিটি প্রজন্মে নতুন করে শাফল করে নেয়া। বিবর্তনের কয়েকশ কোটি বছরের ইতিহাসে দুটো কৌশলই টিকে রয়েছে। আর সম্ভবত সেটাই বংশবিস্তারের সবচেয়ে চমৎকার বিষয়।
