মাতৃধারার ডিএনএ
আমাদের শরীরের ডিএনএর বেশির ভাগ অংশ থাকে কোষের নিউক্লিয়াসে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নিউক্লিয়াসের বাইরেও সামান্য কিছু ডিএনএ রয়েছে। তার ঠিকানা হলো কোষের ক্ষুদ্র এক অঙ্গাণু, যার নাম মাইটোকন্ড্রিয়া। এই ডিএনএকেই বলা হয়, মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বা mtDNA।
মাইটোকন্ড্রিয়া হলো কোষের ‘পাওয়ার হাউস’। আমরা যে খাবার খাই, তাকে কোষের ব্যবহারযোগ্য শক্তি, ATP-তে রূপান্তরের বড় অংশই ঘটে এখানে। কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, এর নিজেরই ছোট্ট একটি জিনোম রয়েছে। মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বৃত্তাকার এবং এতে রয়েছে মাত্র ১৬,৫৬৯টি বেস পেয়ার ও ৩৭টি জিন। এই জিনগুলো মূলত মাইটোকন্ড্রিয়ার শক্তি উৎপাদন এবং সেই কাজে প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে নিউক্লিয়াসে থাকা মানুষের জিনোমে রয়েছে ৩২০ কোটি বেস পেয়ার এবং প্রায় ২০ হাজার জিন। এই জিনগুলো আমাদের দেহের সার্বিক গঠন ও জৈবিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের সম্পূর্ণ জিনোমের তুলনায় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ অতি সামান্য। কিন্তু এত ছোট হওয়া সত্ত্বেও মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএর গল্পটা অসাধারণ।
প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ার স্মৃতি
মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজের ডিএনএ কেন থাকবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রায় দুই বিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীতে। বিজ্ঞানীদের বহুল স্বীকৃত এন্ডোসিমবায়োটিক তত্ত্ব অনুযায়ী, মাইটোকন্ড্রিয়ার পূর্বপুরুষ ছিল এক ধরনের প্রোটিওব্যাকটেরিয়া।
কোনো এক প্রাচীন সময়ে আদিম একটি কোষ সেই ব্যাকটেরিয়াকে নিজের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলে। কিন্তু তাকে হজম করে ফেলেনি। বরং দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে সহযোগিতার সম্পর্ক। জীববিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে, সিমবায়োসিস। ব্যাকটেরিয়াটি কোষকে দক্ষভাবে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করত, আর কোষ তাকে দিত নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্য।
বিবর্তনের দীর্ঘ পথে সেই ব্যাকটেরিয়াই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আজকের মাইটোকন্ড্রিয়া। আর তার প্রাচীন স্বাধীন জীবনের একটি স্মৃতি আজও রয়ে গেছে তার নিজস্ব ডিএনএতে।
মায়ের ডিএনএ
মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমরা নিউক্লিয়ার ডিএনএর অর্ধেক পাই বাবার কাছ থেকে, আর বাকি অর্ধেক মায়ের কাছ থেকে। কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর পুরোটাই আসে মায়ের কাছ থেকে। কারণ গর্ভধারণের সময় ভ্রূণের মাইটোকন্ড্রিয়ার সবটাই আসে মায়ের ডিম্বাণু থেকে। শুক্রাণুর মাইটোকন্ড্রিয়া সাধারণত পরবর্তী প্রজন্মে টিকে থাকে না।
ফলে একজন মায়ের mtDNA তাঁর ছেলে ও মেয়ে দুজনেই পায়। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে সেটি পৌঁছে দিতে পারে কেবল তাঁর মেয়েরা। এইভাবে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর ধারাবাহিকতা অনুসরণ করলে পাওয়া যায় মানুষের মাতৃধারার প্রাচীন ইতিহাস।
পেছনে ফিরে যাওয়া
মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর সাহায্যে মাতৃবংশের রেখা হাজার হাজার প্রজন্ম পেছনে অনুসরণ করা সম্ভব। মানুষের এক প্রজন্ম গড়ে ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরলে এক হাজার প্রজন্ম মানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার বছর। আর কয়েক হাজার প্রজন্ম পেছনে গেলে আমরা পৌঁছে যাই এক থেকে দুই লাখ বছর আগের মানুষের কাছে।
তবে এখানে ‘অনুসরণ’ করার অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞানীরা প্রতিটি প্রজন্মের নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় বের করতে পারেন। সময়ের সঙ্গে mtDNA-তে ছোট ছোট মিউটেশন জমা হয়। সেই মিউটেশন তুলনা করেই বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন মাতৃবংশের জিনগত শাখা বা lineage। এটা অনেকটা একটি বিশাল পারিবারিক গাছের ডালপালা ধরে উল্টো পথে অনুসরণ করার মতো।
জিনগত ঘড়ি
এই মিউটেশনগুলোই এক ধরনের জিনগত ঘড়ির কাজ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর mtDNA তুলনা করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতে পারেন, তাদের মাতৃবংশ কতটা কাছাকাছি এবং বহু হাজার বছর আগে মানুষের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কীভাবে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই গবেষণা থেকেই এসেছে বিখ্যাত ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ ধারণা। নামটি শুনে মনে হতে পারে তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম নারী। কিন্তু আসলে তা নয়। তিনি ছিলেন এমন একজন নারী, যাঁর মাতৃবংশীয় ধারা আজকের সব জীবিত মানুষের মধ্যে এসে মিলেছে।
বর্তমান জিনগত গবেষণা অনুযায়ী, তিনি সম্ভবত আফ্রিকায় প্রায় এক থেকে দুই লাখ বছর আগে বাস করতেন। অর্থাৎ আনুমানিক ৪,০০০ থেকে ৮,০০০ প্রজন্ম আগে। তাঁর সময়েও আরও অসংখ্য নারী ছিলেন। কিন্তু তাঁদের নিরবচ্ছিন্ন মাতৃবংশীয় ধারা আজ পর্যন্ত টিকে নেই। কারণ মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর বংশপরম্পরা শুধু টিকে থাকে মা থেকে মেয়ে, সেই মেয়ে থেকে তার মেয়ে, তারপর আবার তার মেয়ে – এভাবে একটানা মাতৃধারায়। হাজার হাজার প্রজন্মের পথে অন্য নারীদের মাতৃধারা কোনো না কোনো সময় মেয়ের অভাবে থেমে গেলেও, একজন নারীর মাতৃধারা অবিচ্ছিন্নভাবে টিকে গেছে। তিনিই হলেন, ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ ।
পরিসংখ্যানের বিচারে ব্যাপারটি বিস্ময়কর। হাজার হাজার প্রজন্ম ধরে মা থেকে মেয়ের অবিচ্ছিন্ন ধারা বজায় রেখে একটি মাত্র প্রাচীন মাতৃবংশের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ আজও আমাদের শরীরে তার চিহ্ন বহন করে চলেছে।
ক্ষুদ্র ডিএনএ, বিশাল ইতিহাস
আগেই বলেছি, মানুষের বিশাল জিনোমের পাশে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ নিতান্তই ক্ষুদ্র। অথচ এই অতি ক্ষুদ্র বৃত্তাকার ডিএনএর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিবর্তনের দুটি অসাধারণ গল্প।
একটি হলো, কীভাবে বহু প্রাচীন এক ব্যাকটেরিয়া বিবর্তনের পথে আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেল। আর অন্যটি হলো, কীভাবে বংশপরম্পরায় একটি অতি ক্ষুদ্র ডিএনএ অণু ধরে রেখেছে মানুষের হাজার হাজার প্রজন্মের মাতৃধারার ইতিহাস।
মাইটোকন্ড্রিয়া তাই শুধু শক্তি উৎপাদনের কারখানাই নয়, এতে রয়েছে বিবর্তনের সুদূর অতীতের এক জীবন্ত ইতিহাস।
