মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানমহাবিশ্বে নতুন চোখ

মহাবিশ্বে নতুন চোখ

৩০ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ২৮ 💬 ০
মহাবিশ্বে নতুন চোখ

আগামীকাল, ৩০ আগস্ট ২০২৬, মহাকাশে উৎক্ষেপণ হতে যাচ্ছে নাসার নতুন “ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ”। সব প্রস্তুতি শেষ। নাসা ইতিমধ্যে মিশনটিকে উৎক্ষেপণের জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছে। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে একটি স্পেসএক্স ফ্যালকন হেভি রকেট এটিকে নিয়ে যাবে মহাকাশে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের অনেক গভীরে তাকিয়ে একের পর এক বিস্ময়কর ছবি পাঠাচ্ছে। তাহলে আবার নতুন টেলিস্কোপের প্রয়োজন কেন?কারণ রোমান দেখবে মহাবিশ্বকে একেবারে ভিন্ন দৃষ্টিতে।

বিশাল দৃষ্টিসীমা

রোমানের মূল আয়নার ব্যাস ২.৪ মিটার। মজার ব্যাপার হলো, হাবল স্পেস টেলিস্কোপের আয়নার ব্যাসও ঠিক একই। কিন্তু পার্থক্যটা অন্য জায়গায়।

রোমান টেলিস্কোপ একবারে আকাশের যে পরিমাণ এলাকা দেখতে পারবে, সেটা হাবলের তুলনায় অন্তত ১০০ গুণ বেশি। নাসার হিসাবে, হাবলের মতো সূক্ষ্মতা বজায় রেখেও রোমান আকাশ জরিপ করতে পারবে প্রায় এক হাজার গুণ দ্রুত।

সহজভাবে বললে, হাবল যদি মহাবিশ্বকে টেলিফটো লেন্স দিয়ে দেখে, রোমান অনেকটা একই সূক্ষ্মতায় বিশাল একটি ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল ছবি তুলবে।

এক বিলিয়ন গ্যালাক্সি

রোমানের প্রধান যন্ত্র ওয়াইড ফিল্ড ইনস্ট্রুমেন্ট। এটি একটি বিশাল নিয়ার-ইনফ্রারেড ক্যামেরা। এর সাহায্যে মহাকাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বারবার পর্যবেক্ষণ করা হবে।

মিশনের সময় রোমান প্রায় এক বিলিয়ন গ্যালাক্সির আলো পরিমাপ করতে পারে। এত বিপুল সংখ্যক গ্যালাক্সির অবস্থান, দূরত্ব ও বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর একটি বিশাল মানচিত্র তৈরি করতে পারবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

আর সেই মানচিত্র থেকেই হয়তো পাওয়া যাবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় কয়েকটি রহস্যের সূত্র।

অদৃশ্য মহাবিশ্ব

পৃথিবী থেকে আমরা খালি চোখে বা টেলিস্কোপে যেসব নক্ষত্র, গ্যালাক্সি আর নীহারিকা দেখি, সেগুলো আসলে মহাবিশ্বের অতি সামান্য অংশ। বাকি মহাবিশ্বের বিশাল অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি।

ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব বোঝা যায়। আর ডার্ক এনার্জি নাম দেওয়া হয়েছে সেই অজানা শক্তিকে, যার সঙ্গে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

রোমান টেলিস্কোপ গ্যালাক্সির বণ্টন, মহাকর্ষীয় লেন্সিং এবং মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস অত্যন্ত বড় পরিসরে পর্যবেক্ষণ করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এসব তথ্য ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে নতুন সূত্র দেবে।

জেমস ওয়েব থেকে কেন আলাদা?

জেমস ওয়েব এবং রোমান টেলিস্কোপকে প্রতিদ্বন্দ্বী না বলে বরং পরস্পরের পরিপূরক বলা ভালো। জেমস ওয়েবের ৬.৫ মিটার আয়না রোমানের ২.৪ মিটার আয়নার চেয়ে অনেক বড়। ফলে জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের খুব ক্ষুদ্র একটি অঞ্চলের অত্যন্ত ম্লান ও দূরবর্তী বস্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কিন্তু রোমানের শক্তি অন্য জায়গায়। এর দৃষ্টিসীমা বিশাল। এটি দ্রুত আকাশের বিরাট এলাকা জরিপ করে অসংখ্য গ্যালাক্সি, সুপারনোভা ও গ্রহের তথ্য সংগ্রহ করবে। সহজভাবে বললে, জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গভীরভাবে তাকাবে, আর রোমান দেখবে মহাবিশ্বের বিশাল ক্যানভাস। রোমান কোনো আকর্ষণীয় বস্তু খুঁজে পেলে জেমস ওয়েব পরে সেটিকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

দূরের গ্রহ

রোমানের আরেকটি বড় কাজ হবে আমাদের সৌরজগতের বাইরে গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট খোঁজা। বিশেষ করে গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং ব্যবহার করে এটি এমন অনেক গ্রহ শনাক্ত করতে পারবে, যেগুলো অন্য পদ্ধতিতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এর ফলে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কী ধরনের গ্রহমণ্ডল রয়েছে, তার একটি বড় পরিসংখ্যান তৈরি করা সম্ভব হবে।

রোমানের সঙ্গে রয়েছে পরীক্ষামূলক করোনাগ্রাফ ইনস্ট্রুমেন্ট। এটি কোনো নক্ষত্রের উজ্জ্বল আলো আটকে দিয়ে তার আশপাশের অত্যন্ত ম্লান গ্রহকে সরাসরি দেখার প্রযুক্তি পরীক্ষা করবে। এই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতে পৃথিবীর মতো দূরের কোনো গ্রহের সরাসরি ছবি তোলার পথ আরও প্রশস্ত করতে পারে।

পৃথিবী থেকে অনেক দূরে

উৎক্ষেপণের পর রোমান পৃথিবীর চারপাশে সাধারণ কক্ষপথে থাকবে না। এটি চলে যাবে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরের সূ লাগ্রান্জ-২ বা এল-২ অঞ্চলে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও এই অঞ্চল থেকে কাজ করছে। একটি এমন এক অঞ্চল, যেখানে সূর্য ও পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবের ভারসাম্যকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশযান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারে।

রোমানের প্রাথমিক মিশন পাঁচ বছরের। তবে সম্ভব হলে একে আরও দীর্ঘ সময় সচল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। উৎক্ষেপণের পর যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও ক্যালিব্রেশন শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগবে।

একজন নারী বিজ্ঞানীর নামে

টেলিস্কোপটির নাম রাখা হয়েছে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামে। তিনি ছিলেন নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং সংস্থাটির প্রথম নারী নির্বাহীদের একজন। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ বাস্তবে রূপ দেওয়ার পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তাঁকে অনেক সময় বলা হয় ‘মাদার অব হাবল’।

একসময় যে নারী মহাকাশে হাবল পাঠানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, এবার তাঁর নাম বহন করেই আরেকটি টেলিস্কোপ যাচ্ছে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতে।

হাবল আমাদের দেখিয়েছে মহাবিশ্ব কত সুন্দর। জেমস ওয়েব দেখাচ্ছে মহাবিশ্ব কতটা গভীর। আর রোমান হয়তো দেখাবে মহাবিশ্ব আসলে কত বিশাল। রোমান টেলিস্কোপের যাত্রা শুভ হোক।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।