মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাপ্রকৃতি ও পরিবেশবিপর্যয়ের আগাম বার্তা

বিপর্যয়ের আগাম বার্তা

৩০ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৫ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৫৬ 💬 ০
বিপর্যয়ের আগাম বার্তা

পর্বতের অনেক ওপরে হঠাৎ ভেঙে পড়ল হিমবাহ। সঙ্গে নেমে এলো লাখ লাখ টন বরফ আর পাথর। আটকে গেল নদীর প্রবাহ। তারপর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড বেগে পানি, কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল ছুটে গেল নিচের জনপদের দিকে। পুরো ঘটনাটি ঘটলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে। ধ্বংস হয়ে গেল বিস্তীর্ণ এলাকা। এখন পর্যন্ত হিসেবে নিহত ছয়শোর বেশি মানুষ, আর নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার। যাদের হয়তো কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – এ ধরনের দুর্যোগ কি আগে থেকে বোঝা সম্ভব? মানুষকে কি আগাম সতর্ক করা যায়? এর উত্তর – কিছু ক্ষেত্রে হ্যাঁ। বর্তমান প্রযুক্তিতে বিপদের অনেক পূর্বসংকেত শনাক্ত করা সম্ভব। তবে সব বিপর্যয়ের আগাম পূর্বাভাস দেওয়া এখনো সম্ভব‌ নয়।

আকাশ থেকে নজরদারি

হিমালয়ের মতো দুর্গম এলাকায় বিপদের প্রথম প্রহরী হতে পারে আকাশে থাকা স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পারেন কোন হিমবাহ দ্রুত গলছে, কোথায় নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে, কোন হ্রদ অস্বাভাবিক দ্রুত বড় হচ্ছে কিংবা পাহাড়ের কোনো ঢাল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে কি না। একই জায়গার দীর্ঘদিনের ছবি পাশাপাশি রাখলে খুব সামান্য পরিবর্তনও ধরা পড়ে। অর্থাৎ বিপর্যয় ঘটার অনেক আগেই সম্ভাব্য বিপজ্জনক এলাকাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।

পাহাড়ের গায়ে সেন্সর

স্যাটেলাইটের পাশাপাশি বিপজ্জনক পাহাড় ও হিমবাহে বসানো যায় বিভিন্ন ধরনের সেন্সর। কোনো পাহাড়ের ঢাল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে কি না, বরফের স্তরে ফাটল বাড়ছে কি না কিংবা মাটির ভেতরে অস্বাভাবিক কম্পন হচ্ছে কি না – এসব সেন্সর দিয়ে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করা যায়। বড় ধরনের ভূমিধস বা হিমবাহ ধসের আগে অনেক সময় খুব ছোট ছোট নড়াচড়া ও ভূকম্পন শুরু হয়। সেন্সর সেই পরিবর্তন ধরতে পারলে বিপদের আভাস পাওয়া যেতে পারে। তবে সব ধসের ক্ষেত্রে এমন পূর্বসংকেত পাওয়া যায় না। এটাই সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।

লেজারের চোখে পাহাড়

এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে লাইডার প্রযুক্তি। লেজার রশ্মি ব্যবহার করে এটি পাহাড়, হিমবাহ ও ভূমির পৃষ্ঠের অত্যন্ত নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করতে পারে। বিমান বা ড্রোনে লাইডার বসিয়ে একই পাহাড়ি এলাকা নিয়মিত স্ক্যান করা হলে সময়ের সঙ্গে ভূমির খুব সামান্য পরিবর্তনও ধরা সম্ভব। কোথাও নতুন ফাটল তৈরি হচ্ছে কি না, পাহাড়ের ঢাল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে কি না কিংবা হিমবাহের পৃষ্ঠের আকৃতি বদলে যাচ্ছে কি না এসব পরিবর্তন বিপদের আগাম সংকেত হতে পারে। বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পাহাড়ের সামনে স্থলভিত্তিক লাইডার বসিয়েও একই এলাকা বারবার স্ক্যান করা যায়। এর সঙ্গে স্যাটেলাইট রাডার, ভূকম্পন সেন্সর ও জিপিএস যুক্ত করলে পাহাড়ের অস্বাভাবিক নড়াচড়া শনাক্ত করার ক্ষমতা আরও বাড়ে। লাইডার অবশ্য ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে না। এর আসল শক্তি হলো, লেজারের চোখে প্রায় অদৃশ্য পরিবর্তনকেও দৃশ্যমান করে তোলা।

হ্রদের ওপর পাহারা

হিমবাহ গলে পাহাড়ের ওপরে অনেক সময় বিশাল হ্রদ তৈরি হয়। বরফ, পাথর ও আলগা মাটি দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ সেই পানি আটকে রাখে। তারপর কোনো কারণে বাঁধটি ভেঙে গেলে হঠাৎ বিপুল পানি নিচে নেমে আসে। একেই বলা হয় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (GLOF)। এ ধরনের বিপজ্জনক হ্রদে স্বয়ংক্রিয় জলস্তর-মাপক যন্ত্র বসানো যায়। পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে কিংবা হঠাৎ কমতে শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে সংকেত পাঠাবে যন্ত্রটি। আবার অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের পানি আবার কৃত্রিম নালা বা বিশেষ নিষ্কাশনব্যবস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নামিয়ে দেওয়া যায়। নেপালের কিছু হিমবাহ হ্রদে ইতিমধ্যেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নদীও জানাবে বিপদের খবর

আরও কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে নদীর উজানে একের পর এক স্বয়ংক্রিয় জলস্তর ও প্রবাহ মাপক যন্ত্র বসানো। ধরা যাক, তিব্বতের পাহাড়ে কোনো প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেল। প্রথম সেন্সরটি দেখল নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই তথ্য চলে গেল কেন্দ্রীয় কম্পিউটারে। সেই কম্পিউটার হিসাব করে বলতে পারে ঢলটি কত দ্রুত এগোচ্ছে এবং কোন কোন জনপদে কখন পৌঁছাতে পারে। তারপর মানুষের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজতে পারে সাইরেন। একই সঙ্গে মানুষের মোবাইল ফোনে পৌঁছে যেতে পারে জরুরি সতর্কবার্তা।

দশ মিনিটও মূল্যবান

সমস্যা হলো, হিমালয়ের খাড়া পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা অত্যন্ত দ্রুত ছুটতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপদ শনাক্ত করার পর হাতে হয়তো মাত্র দশ বা বিশ মিনিট সময় পাওয়া যাবে। শুনতে খুব কমসময় মনে হয়। কিন্তু আগে থেকেই মানুষ যদি জানে সাইরেন বাজলে কোথায় যেতে হবে, কোন রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের উঁচু জায়গায় উঠতে হবে এবং কোথায় নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে, তাহলে এই দশ মিনিটই শত শত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই শুধু প্রযুক্তি বসালেই হবে না। নিয়মিত মহড়া এবং স্থানীয় মানুষের প্রশিক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ধ্বংসযজ্ঞ সীমান্ত মানে না

হিমালয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা আছে। বিপদ তৈরি হতে পারে এক দেশে, কিন্তু তার ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হতে পারে অন্য দেশে। তিব্বতের কোনো পাহাড় বা হিমবাহে ধস নামলে সেই ঢল অল্প সময়ের মধ্যেই নেপালে পৌঁছে যেতে পারে। আবার নেপাল থেকে সেই পানি আরও নিচে ভারত ও বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় চলে আসে। তাই প্রয়োজন চীন, নেপাল, ভারত, ভূটান এবং বাংলাদেশ সহ হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা। উজানে কোনো সেন্সর বিপদের সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাটির দেশকেও সেটা জানতে হবে।

মৃত্যু ঠেকানো জরুরী

প্রকৃতির বিপর্যয় মানুষ ঠেকাতে পারবে না। হিমবাহ ভাঙবে। পাহাড় ধসে পড়বে। প্রবল বৃষ্টিতে নদী ফুলে উঠবে। কখনো প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হবে, আবার সেটি ভেঙেও যাবে। কিন্তু একুশ শতকে মানুষের হাতে এমন কিছু প্রযুক্তি রয়েছে, যার সাহায্যে পাহাড়ের নড়াচড়া থেকে শুরু করে নদীর পানির উচ্চতা পর্যন্ত প্রায় সারাক্ষণ নজরে রাখা সম্ভব। স্যাটেলাইট, লাইডার, সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র, নদী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, কম্পিউটার ভিত্তিক পূর্বাভাস এবং মোবাইল সতর্কবার্তা- এসবগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারলেই তৈরি হতে পারে হিমালয়ের জন্য শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ নেটওয়ার্ক। প্রকৃতির বিপর্যয় হয়তো বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু সেই বিপর্যয়কে হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হওয়া অনেক ক্ষেত্রেই ঠেকানো সম্ভব। এটাই নেপালের সাম্প্রতিক মানবিক বিপর্যয় থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা খুব ব্যয়বহুল কোন প্রযুক্তি নয়; বরং বিপর্যয়ের মানবিক ক্ষতির তুলনায় এই বিনিয়োগ হবে সামান্য।

Raisul Sohan

bichitrobiggan.com

বিজ্ঞান অনুরাগী। শখের বিজ্ঞান লেখক।