মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাজীবনের বিজ্ঞানজিএম ফসলের জননী

জিএম ফসলের জননী

১৪ আগস্ট, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ২৯৫ 💬 ০
জিএম ফসলের জননী
আজ পৃথিবীর বহু দেশে কোটি কোটি হেক্টর জমিতে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা জিএম ফসল চাষ হচ্ছে। উদ্ভিদের শরীরে নতুন জিন ঢুকিয়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য তৈরির এই প্রযুক্তির পেছনে যাঁদের মৌলিক অবদান রয়েছে, তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন মার্কিন বিজ্ঞানী মেরি-ডেল চিলটন। এই অসামান্য অবদানের জন্যই তিনি পরিচিতি পেয়েছেন, ‘জিএম ফসলের জননী’ হিসেবে।
আধুনিক উদ্ভিদ জৈবপ্রযুক্তির এই পথিকৃৎ এ বছরের ২৪ জুন, ৮৭ বছর বয়সে মারা গেছেন।

প্রকৃতির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার

মেরি-ডেল চিলটনের গবেষণার কেন্দ্রে ছিল মাটিতে বসবাসকারী এক অদ্ভুত ব্যাকটেরিয়া, যার নাম অ্যাগ্রোব্যাকটেরিয়াম টিউমেফেসিয়েন্স। এই ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদকে আক্রান্ত করে ‘ক্রাউন গল’ নামে টিউমারের মতো বৃদ্ধি তৈরি করে।
সত্তরের দশকে চিলটন ও তাঁর সহকর্মীরা দেখান, ব্যাকটেরিয়াটি তার টিআই প্লাজমিড থেকে ডিএনএর একটি অংশ উদ্ভিদকোষে পাঠিয়ে দেয়। সেই ডিএনএ পরে উদ্ভিদের নিজস্ব জিনোমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
অর্থাৎ প্রকৃতি মানুষের বহু আগেই এক জীব থেকে অন্য জীবে জিন স্থানান্তরের কৌশল আবিষ্কার করে রেখেছিল।
মজার ব্যাপার হলো, চিলটন প্রথমে এই ধারণাটি বিশ্বাস করেননি। বরং সেটি ভুল প্রমাণ করতে গিয়ে তাঁর পরীক্ষাই শেষ পর্যন্ত এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ হাজির করে।

ব্যাকটেরিয়া হলো জিনের বাহন

এরপর চিলটনের মাথায় এল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ব্যাকটেরিয়া যদি নিজের ডিএনএ উদ্ভিদের মধ্যে ঢোকাতে পারে, তাহলে তার রোগ সৃষ্টিকারী জিন সরিয়ে সেখানে বিজ্ঞানীদের পছন্দের কোনো জিন বসিয়ে দিলে কী হবে?
চিলটন দেখালেন, রোগ সৃষ্টিকারী জিন সরিয়ে ফেললেও ব্যাকটেরিয়াটির উদ্ভিদকোষে ডিএনএ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে। এর ফলে অ্যাগ্রোব্যাকটেরিয়ামকে জিন বহনকারী বাহন হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এই আবিষ্কারই পরে উদ্ভিদ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথ খুলে দেয়।

জন্ম নিল জিএম উদ্ভিদ

আশির দশকের গোড়ায় মেরি-ডেল চিলটন ও তাঁর গবেষক দল অ্যাগ্রোব্যাকটেরিয়ামকে ব্যবহার করে তামাকের কোষে নতুন জিন প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়। পরে সেই পরিবর্তিত কোষ থেকে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ তৈরি করা হয়। দেখা গেল, নতুন জিনটি পরবর্তী প্রজন্মেও যেতে পারে।
১৯৮৩ সালে এই সাফল্য উদ্ভিদবিজ্ঞানে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রায় একই সময়ে মার্ক ভ্যান মন্টেগু এবং রবার্ট ফ্রেলির গবেষক দলও স্বাধীনভাবে ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ তৈরিতে সাফল্য পায়। তাই পৃথিবীর প্রথম জিএম উদ্ভিদ তৈরির কৃতিত্ব কোনো একজন বিজ্ঞানীর নয়।
তবে এই প্রযুক্তির পেছনের মৌলিক প্রক্রিয়াটি বোঝা এবং অ্যাগ্রোব্যাকটেরিয়ামকে জিন বহনের হাতিয়ারে পরিণত করার ক্ষেত্রে চিলটনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণাগার থেকে জৈবপ্রযুক্তি

১৯৮৩ সালে চিলটন যোগ দেন সিবা-গাইগি প্রতিষ্ঠানে, যেটা পরে সিনজেনটার অংশ হয়। সেখানে তিনি কৃষি জৈবপ্রযুক্তির বড় একটি গবেষণা কর্মসূচি গড়ে তোলেন। এরপর এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পোকামাকড় ও রোগ প্রতিরোধীসহ নানা বৈশিষ্ট্যের জিএম ফসল তৈরির গবেষণা এগিয়ে যেতে থাকে।
এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে মেরি-ডেল চিলটন, মার্ক ভ্যান মন্টেগু ও রবার্ট ফ্রেলি যৌথভাবে বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার পান। এই পুরস্কারকে অনেক সময় ‘কৃষির নোবেল পুরস্কার’ বলে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীতে মেরি-ডেল চিলটন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশনও লাভ করেন।

প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা

চিলটনের গবেষণার গল্পে সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি সম্ভবত এখানেই। মানুষ উদ্ভিদের জিন পরিবর্তনের কৌশলটি একেবারে শূন্য থেকে তৈরি করেনি। প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া বহু আগে থেকেই সেই কাজ করে আসছিল। বিজ্ঞানীরা সেই প্রাকৃতিক কৌশলটি বুঝেছেন, তারপর নিজেদের প্রয়োজনমতো কাজে লাগিয়েছেন।
আর সেই প্রাকৃতিক রহস্যটি বুঝতে যাঁরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, চিলটন ছিলেন তাঁদের একজন। তাঁর গবেষণা খুলে দিয়েছিল আধুনিক জিএম ফসলের জগতের দরজা।
আজকের জিএম ফসলের ইতিহাস খুঁজতে গেলে তাই ফিরে আসতে হয় মেরি-ডেল চিলটনের কাছে।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।