Homeপদার্থ বিজ্ঞানকোয়ার্কের জগৎ

কোয়ার্কের জগৎ

আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান সবকিছু, পাহাড়, নদী, গাছপালা, এমনকি আমাদের শরীর – সবই পরমাণু দিয়ে তৈরি। একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন পরমাণুই হলো পদার্থের সবচেয়ে ক্ষুদ্র একক। পরে জানা গেল, পরমাণুর ভেতরে রয়েছে প্রোটন ও নিউট্রন। কিন্তু গল্পটি সেখানেও শেষ নয়। প্রোটন ও নিউট্রনের গভীরে লুকিয়ে আছে আরও রহস্যময় এক জগত। আর সেটা হলো, কোয়ার্কের জগৎ।
কোয়ার্ক হলো প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম মৌলিক কণা। এদেরকে আর ছোট কোনো অংশে ভাঙা যায় না। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ছয় ধরনের কোয়ার্কের কথা জানেন‌- আপ, ডাউন, স্ট্রেঞ্জ, চার্ম, টপ এবং বটম।
নামগুলো শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এদের নিয়েই গড়ে উঠেছে দৃশ্যমান মহাবিশ্ব।
প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা প্রোটন ও নিউট্রন আসলে তিনটি করে কোয়ার্কের সমন্বয়ে তৈরি। একটি প্রোটনের ভেতরে থাকে দুটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ক। অন্যদিকে নিউট্রনের ভেতরে থাকে দুটি ডাউন কোয়ার্ক ও একটি আপ কোয়ার্ক। অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই কণাগুলোই শেষ পর্যন্ত গড়ে তুলেছে গ্রহ, নক্ষত্র এবং জীবনের ভিত্তি।
কিন্তু কোয়ার্কের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এদের কখনো একা দেখা যায় না। প্রকৃতি যেন তাদের ওপর এক বিশেষ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যত শক্তিই প্রয়োগ করা হোক না কেন, কোনো কোয়ার্ককে তার সঙ্গীদের থেকে আলাদা করা যায় না। কোয়ার্কের এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয়, কনফাইনমেন্ট।
এই বন্ধনের নেপথ্যে কাজ করে গ্লুওন নামের এক বলবাহী কণা। নামের মধ্যেই যেন তার পরিচয় লুকিয়ে আছে। ইংরেজি গ্লু শব্দের অর্থ আঠা। গ্লুওনও ঠিক তেমনই কোয়ার্কগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে। তবে এটি কোনো সাধারণ আঠা নয়।
কোয়ার্কগুলোকে যত দূরে সরানোর চেষ্টা করা হয়, বন্ধন ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যেন একটি অদ্ভুত মহাজাগতিক রাবার ব্যান্ড, যেটা টানলে ছিঁড়ে যাওয়ার বদলে আরও শক্ত হয়ে যায়।
কোয়ার্কদের আরেকটি বিচিত্র বৈশিষ্ট্য হলো তাদের “রং”। অবশ্য এটি আমাদের পরিচিত লাল, নীল বা সবুজ রং নয়। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে “কালার” হলো একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যেটা স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্সকে কাজ করতে সাহায্য করে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত রঙের খেলাই পরমাণুর কেন্দ্রকে স্থিতিশীল রাখে।
আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাগারে একক কোয়ার্ক ধরা যায়নি। কিন্তু তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে অসংখ্য পরীক্ষায়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টিক্যাল এক্সেলেটারের ভেতরে উচ্চশক্তির সংঘর্ষগুলোতে বিজ্ঞানীরা বারবার কোয়ার্কের আচরণের ছাপ দেখতে পান।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, বস্তুর অধিকাংশ ভরও সরাসরি কোয়ার্ক থেকে আসে না। প্রোটনের ভেতরে কোয়ার্ক ও গ্লুওনের অবিশ্বাস্য গতিশীল নৃত্যের ফলে যে শক্তি সৃষ্টি হয়, তারই বড় অংশ পরিণত হয় ভরে। অর্থাৎ আইনস্টাইনের বিখ্যাত ধারণা অনুযায়ী, আমরা এক অর্থে জমাট বাঁধা শক্তির তৈরি।
মহাবিশ্বের গভীরে তাকালে দেখা যায়, দৃশ্যমান জগতের সমস্ত বৈচিত্র্যের পেছনে লুকিয়ে আছে ক্ষুদ্র কোয়ার্কের জগত। তারা এত ছোট যে সরাসরি দেখা যায় না, আবার এত গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের ছাড়া নক্ষত্র, গ্রহ, মানুষ কিছুই অস্তিত্ব পেত না। মহাবিশ্বের বিশালতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর ক্ষুদ্র জগৎ, যেখানে কোয়ার্করা চিরকাল অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা থেকে সৃষ্টি করেছে বাস্তবতার ভিত্তি।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular