মূল কন্টেন্টে যান
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › মহাকাশ বিজ্ঞান › জেমস ওয়েবের চোখে মহাবিশ্ব

জেমস ওয়েবের চোখে মহাবিশ্ব

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

⏱ ৬ মিনিট পড়ার সময়

👁 ২৪ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
জেমস ওয়েবের চোখে মহাবিশ্ব

মহাকাশে পাঠানোর আগে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ আমাদের মহাবিশ্ব দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। কথাটা যে এত দ্রুত সত্যি হয়ে যাবে, সম্ভবত অনেকেই ভাবেননি।

২০২২ সালে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শুরু করার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জেমস ওয়েব এমন সব জিনিস দেখেছে, যেগুলো মহাবিশ্বের প্রথম গ্যালাক্সি, ব্ল্যাকহোল, নক্ষত্র ও দূরের গ্রহ সম্পর্কে আমাদের অনেক পুরোনো ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

জেমস ওয়েব শুধু ছবি তোলার টেলিস্কোপ নয়। এর আসল শক্তি ইনফ্রারেড আলো এবং স্পেকট্রোস্কোপি। জেমস ওয়েব দূরের কোনো বস্তু থেকে আসা আলো বিশ্লেষণ করে সেই বস্তুর তাপমাত্রা, গতি, এমনকি রাসায়নিক গঠনও বের করতে পারে। প্রথম তিন বছরের হিসেবে জেমস ওয়েবের পর্যবেক্ষণ সময়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ব্যবহৃত হয়েছে স্পেকট্রোস্কোপিতে, আর প্রায় এক-চতুর্থাংশ সরাসরি ছবি তোলায়।

তাহলে এ পর্যন্ত কী কী চমক দেখিয়েছে জেমস ওয়েব?

মহাবিশ্বের শৈশব

আলো যত দূর থেকে আসে, আমরা তত অতীতকে দেখি। জেমস ওয়েব এখন আমাদের এমন সময়ের মহাবিশ্ব দেখাচ্ছে, যখন তার বয়স ছিল মাত্র কয়েকশ মিলিয়ন বছর। আর মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স আনুমানিক ১৩,৮০০ মিলিয়ন বছর।

জেমস ওয়েবের অন্যতম বড় আবিষ্কার মোম-জেড১৪। এই গ্যালাক্সিটির রেডশিফট ১৪.৪৪। আমরা এটিকে দেখছি বিগ ব্যাংয়ের মাত্র প্রায় ২৮০ মিলিয়ন বছর পরের অবস্থায়। বর্তমানে এটিই স্পেকট্রোস্কোপির মাধ্যমে নিশ্চিত সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সি।

চমকটা শুধু দূরত্বে নয়। এত অল্প বয়সের মহাবিশ্বেও মোম-জেড১৪ প্রত্যাশার তুলনায় উজ্জ্বল, কমপ্যাক্ট এবং রাসায়নিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ। অর্থাৎ গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তনের কিছু প্রক্রিয়া সম্ভবত আমাদের ধারণার চেয়েও দ্রুত ঘটেছিল।

এত দ্রুত কীভাবে?

মোম-জেড১৪ একা নয়।

জেমস ওয়েব প্রথম দিকের মহাবিশ্বে আরও বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত উজ্জ্বল ও দ্রুত বিকশিত গ্যালাক্সি দেখতে পেয়েছে। এদের অনেকগুলোর জন্ম বিগ ব্যাংয়ের মাত্র কয়েকশ মিলিয়ন বছর পরেই।

এখানেই বিজ্ঞানীদের জন্য বড় ধাঁধা। এত অল্প সময়ের মধ্যে এগুলো এত উজ্জ্বল ও বিকশিত হলো কীভাবে?

জেমস ওয়েবের তথ্য বলছে, প্রথম দিকের মহাবিশ্বে উজ্জ্বল ও দ্রুত বিকশিত গ্যালাক্সি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। সম্ভবত তখন নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়াও অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকর ছিল।

রহস্যময় লাল বিন্দু

জেমস ওয়েবের সবচেয়ে অদ্ভুত আবিষ্কারগুলোর একটি হলো ‘লিটল রেড ডটস’।

এগুলো খুব ছোট, লাল এবং উজ্জ্বল বস্তু। বিগ ব্যাংয়ের কয়েকশ মিলিয়ন বছর পরের মহাবিশ্বে এদের বিপুল সংখ্যায় দেখা যায়। পরে মহাবিশ্বের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়।

কিন্তু এগুলো আসলে কী?

প্রথম দিকে ধারণা ছিল, এগুলো হয়তো অত্যন্ত ঘন নক্ষত্রে ভরা ছোটখাটো গ্যালাক্সি। আবার অন্য সম্ভাবনা ছিল, এদের ভেতরে লুকিয়ে আছে দ্রুত বেড়ে ওঠা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল।

সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

২০২৬ সালে জেমস ওয়েবের গভীর স্পেকট্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণে একটি লিটল রেড ডটের ভেতরে পদার্থ গিলতে থাকা বিশাল ব্ল্যাকহোলের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব্ল্যাকহোলটি ঘন ও উত্তপ্ত গ্যাসের আবরণে ঢাকা। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের সম্ভাব্য ব্যবস্থাকে বলছেন ‘ব্ল্যাকহোল স্টার’। তবে সব লিটল রেড ডট একই ধরনের বস্তু কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

ব্ল্যাকহোলের ধাঁধা

ব্ল্যাকহোল নিয়ে জেমস ওয়েব আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।

দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা ছিল, প্রথম প্রজন্মের বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যুর পর তৈরি ছোট ছোট ব্ল্যাকহোল ধীরে ধীরে বড় হয়ে একসময় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু সমস্যা হলো সময়। জেমস ওয়েব প্রথম দিকের মহাবিশ্বে এমন সব দ্রুত বেড়ে ওঠা বিশাল ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পাচ্ছে, যেগুলো এত অল্প সময়ে কীভাবে এত বড় হলো, সেটা শুধু ছোট ব্ল্যাকহোল থেকে ধীরে ধীরে বৃদ্ধির সহজ ব্যাখ্যায় বোঝানো কঠিন।

দূর গ্রহের বায়ুমণ্ডল

জেমস ওয়েবের আরেকটি বড় সাফল্য এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণায়।

ওয়াস্প-৩৯বি নামের একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করে জেমস ওয়েব কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করেছে।

অন্যান্য গ্রহের বায়ুমণ্ডলেও পানি, মিথেন, অ্যামোনিয়া, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো অণুর স্বাক্ষর পাওয়া গেছে।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে পৃথিবীর মতো ছোট পাথুরে গ্রহের বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

পাথুরে গ্রহ

পৃথিবী থেকে প্রায় ৪১ আলোকবর্ষ দূরের ৫৫ ক্যানক্রি-ই একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত পাথুরে গ্রহ। এর পৃষ্ঠের বড় অংশ সম্ভবত গলিত লাভায় ঢাকা।

জেমস ওয়েবের পর্যবেক্ষণে সেখানে কার্বন মনোক্সাইড বা কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্ভবত গ্রহটির গলিত পৃষ্ঠ থেকে গ্যাস বেরিয়ে এই বায়ুমণ্ডল তৈরি বা পুনর্গঠিত হচ্ছে।

এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন পাথুরে গ্রহ কীভাবে বায়ুমণ্ডল তৈরি করে এবং প্রতিকূল পরিবেশেও সেটা ধরে রাখতে পারে।

লুকানো গ্রহ

২০২৬ সালে জেমস ওয়েব আরেকটি চমক দেখিয়েছে।

বহু বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা বিটা পিক্টোরিস নক্ষত্র ব্যবস্থায় আগে দুটি বিশাল গ্রহের কথা জানা ছিল। জেমস ওয়েব সেখানে তৃতীয় একটি গ্রহ শনাক্ত করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে, বিটা পিক্টোরিস ডি।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, গ্রহটিকে শুধু সাধারণ একটি উজ্জ্বল বিন্দু হিসেবে দেখে শনাক্ত করা হয়নি। জেমস ওয়েবের স্পেকট্রোস্কোপিতে এর বায়ুমণ্ডলে কার্বন মনোক্সাইডের বিশেষ রাসায়নিক স্বাক্ষর ধরা পড়ে। পরে পানি ও মিথেনের স্বাক্ষরও পাওয়া যায়।

ইউরোপার সমুদ্র

জেমস ওয়েব শুধু দূরের মহাবিশ্ব দেখছে না। আমাদের সৌরজগতেও নতুন তথ্য দিচ্ছে।

বৃহস্পতির বরফে ঢাকা উপগ্রহ ইউরোপার পৃষ্ঠে কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এর উৎস সম্ভবত ইউরোপার বরফের নিচে থাকা বিশাল লবণাক্ত সমুদ্র।

এনসেলাডাসের ফোয়ারা

শনির ছোট উপগ্রহ এনসেলাডাস আরও বিস্ময়কর। এর বরফের নিচেও একটি সমুদ্র রয়েছে। সেখান থেকে বরফের ফাটল দিয়ে মহাকাশে পানি ও জলীয় বাষ্প ছিটকে বেরিয়ে আসে।

জেমস ওয়েব দেখেছে, এই জলীয় বাষ্পের প্রবাহ ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত। এটি এনসেলাডাসের ব্যাসের প্রায় ২০ গুণ বড়।

আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এনসেলাডাস থেকে বেরিয়ে আসা এই পানি শনির চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

গ্রহ না নক্ষত্র?

জেমস ওয়েব এমন কিছু অতি কম ভরের বস্তু খুঁজে পাচ্ছে, যেগুলো গ্রহ আর নক্ষত্রের মাঝামাঝি সীমারেখাটাকেই আরও রহস্যময় করে তুলছে।

এগুলোর একটি শ্রেণিকে বলা হয়, ব্রাউন ডোয়ার্ফ। এরা নক্ষত্রের মতো তৈরি হয়, কিন্তু ভর এত কম যে সাধারণ নক্ষত্রের মতো হাইড্রোজেন ফিউশন দীর্ঘস্থায়ীভাবে চালাতে পারে না।

জেমস ওয়েব এমনসব বস্তু পর্যবেক্ষণ করেছে, যাদের ভর বৃহস্পতির মাত্র কয়েক গুণ। কিছু ক্ষেত্রে এদের আনুমানিক ভর বৃহস্পতির তিন থেকে চার গুণের মতো।

সবচেয়ে বড় আবিষ্কার?

জেমস ওয়েবের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার সম্ভবত কোনো একটি গ্যালাক্সি, গ্রহ কিংবা ব্ল্যাকহোল নয়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে মহাবিশ্বের বিবর্তন নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণার।

শিশু মহাবিশ্বে এত দ্রুত উজ্জ্বল ও বিকশিত গ্যালাক্সি কীভাবে সৃষ্টি হলো? তাদের কেন্দ্রে বিশাল ব্ল্যাকহোল এত দ্রুত কোথা থেকে এলো? সব প্রশ্নের উত্তর এখন বিজ্ঞানীরা খোঁজার চেষ্টা করছেন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত নাসার হিসেব অনুযায়ী, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের প্রথম তিন বছরেই জেমস ওয়েব ৮৬০টির বেশি বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে, প্রায় ৫৫০ টেরাবাইট তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ১,৬০০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

আর টেলিস্কোপটির সামনে এখনো দীর্ঘ সময় পড়ে আছে। তাই বলা যায়, জেমস ওয়েবের গল্প আসলে সবে শুরু হয়েছে।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।