মূল কন্টেন্টে যান
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › মহাকাশ বিজ্ঞান › আকাশ থেকে পাথর

আকাশ থেকে পাথর

২ অক্টোবর, ২০২৬

⏱ ৫ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৪ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
আকাশ থেকে পাথর

আকাশ পরিষ্কার। কোথাও কোন দুর্যোগের ঘনঘটা নেই। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ। আকাশে দেখা গেল আগুনের গোলা। তারপর কোথাও মাঠে, কোথাও বাড়ির ছাদে, কোথাও আবার গাড়ির ওপর এসে পড়ল মহাকাশের পাথর।

শুনতে সিনেমার গল্পের মতো। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা সত্যিই ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন, বিজ্ঞানীরা নমুনা সংগ্রহ করেছেন, পরীক্ষা করেছেন এবং নিশ্চিত হয়েছেন, পাথরগুলো এসেছিল পৃথিবীর বাইরে থেকে।

মজার ব্যাপার হলো, একসময় বিজ্ঞানীরাই বিশ্বাস করতেন না যে আকাশ থেকে পাথর পড়তে পারে।

প্রত্যক্ষ প্রমাণ

১৪৯২ সালের ৭ নভেম্বর। বর্তমান ফ্রান্সের আলসাস অঞ্চলের এনসিসহাইম শহরের কাছে একটি গমক্ষেতে প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়েছিল বিশাল একটি পাথর। এক কিশোর ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিল।

উল্কাপিণ্ডটির মূল ওজন ছিল প্রায় ১২৭ কিলোগ্রাম। এর একটি বড় অংশ আজও সংরক্ষিত আছে। প্রত্যক্ষভাবে দেখা ইউরোপের প্রাচীনতম উল্কাপাতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, যার নমুনা এখনো টিকে আছে।

তবে তখনো বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না, পাথর সত্যিই মহাকাশ থেকে পড়ে কি না।

ধারণা বদল

১৮০৩ সালের ২৬ এপ্রিল ফ্রান্সের ল’এগল অঞ্চলে দিনের আকাশে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। এরপর বিশাল এলাকাজুড়ে আকাশ থেকে ঝরে পড়ল হাজার হাজার পাথরের টুকরো।

ফরাসি বিজ্ঞানী জঁ-বাতিস্ত বিও ঘটনাস্থলে গেলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বললেন, পাথর সংগ্রহ করলেন এবং পরীক্ষা করলেন। তাঁর অনুসন্ধান বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহাকাশ থেকে সত্যিই পাথর পৃথিবীতে এসে পড়তে পারে, এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।

মানুষ আহত

১৯৫৪ সালের ৩০ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামায় নিজের বাড়ির সোফায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ৩৪ বছর বয়সী অ্যান হজেস।

হঠাৎ প্রায় ৩.৯ কিলোগ্রামের একটি উল্কাপিণ্ড বাড়ির ছাদ ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। প্রথমে সেটি একটি বড় রেডিওতে আঘাত করে। তারপর সেখান থেকে ছিটকে এসে সরাসরি লাগে হজেসের শরীরে। আঘাতে তাঁর শরীরে বিশাল কালশিটে দাগ পড়ে। তবে সৌভাগ্যক্রমে তিনি গুরুতরভাবে আহত হননি।

ঘটনাটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। সরাসরি উল্কাপিণ্ডের আঘাতে একজন মানুষ আহত হওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত নথিবদ্ধ ঘটনা হিসেবে এটি পরিচিত। উল্কাপিণ্ডটির নাম, সিলাকগা উল্কাপিণ্ড।

আর গল্প এখানেই শেষ নয়। আকাশ থেকে পড়া পাথরটির মালিক কে, ভাড়াটিয়া হজেস, নাকি বাড়ির মালিক, সেটা নিয়েও বিরোধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত হজেস উল্কাপিণ্ডটি নিজের কাছে পান এবং পরে সেটি আলাবামা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে দান করেন।

জীবনের উপাদান?

এরপর ঘটল উল্কাপিণ্ড গবেষণার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

১৯৬৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ার মারচিসন এলাকার আকাশে একটি উজ্জ্বল আগুনের গোলা দেখা যায়। এরপর বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যায় এবং অসংখ্য উল্কাপিণ্ডের টুকরো প্রায় ৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে উল্কাপিণ্ডের প্রায় ১০০ কিলোগ্রাম নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

কিন্তু আসল চমক ছিল পাথরের ভেতরে। মারচিসন উল্কাপিণ্ড হলো এক ধরনের কার্বনসমৃদ্ধ কনড্রাইট। বিজ্ঞানীরা এর মধ্যে বহু ধরনের জৈব অণু, এমনকি অ্যামিনো অ্যাসিডও খুঁজে পান।

অ্যামিনো অ্যাসিড হলো প্রোটিন তৈরির মৌলিক উপাদান। এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে উল্কাপিণ্ডটির মধ্যে জীবন ছিল। বরং আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। প্রাচীন পৃথিবীতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জৈব রাসায়নিক উপাদান কি গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে এসে থাকতে পারে? এই কারণেই মারচিসন উল্কাপিণ্ড আজও বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গাড়ির ওপর

১৯৯২ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে দেখা গেল উজ্জ্বল একটি আগুনের গোলা। ঘটনাটি আরও অসাধারণ হয়ে ওঠে কারণ আকাশ দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় সেটি বিভিন্ন মানুষের ভিডিও ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল।

শেষ পর্যন্ত এর ১২.৫৭ কিলোগ্রামের একটি খণ্ড নিউইয়র্কের পিকস্কিলে মিশেল ন্যাপের বাড়ির সামনে রাখা একটি শেভ্রোলে মালিবু গাড়ির ওপর আছড়ে পড়ে। পাথরটি গাড়ির পেছনের অংশ ভেদ করে নিচের মাটিতে গিয়ে পড়ে। এর নাম দেওয়া হয়, পিকস্কিল উল্কাপিণ্ড।

ঘরের ভেতর

২০০৪ সালের ১২ জুন নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে ঘটল আরেক অবিশ্বাস্য ঘটনা। একটি বাড়ির ছাদ ভেদ করে প্রায় ১.৩ কিলোগ্রামের একটি উল্কাপিণ্ড ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পাথরটি ছাদ ও সিলিং ভেদ করে একটি সোফায় আঘাত করে। সৌভাগ্যক্রমে কেউ আহত হননি।

পরে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন, পাথরটি সত্যিই মহাকাশ থেকে এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি অকল্যান্ড উল্কাপিণ্ড নামে নথিভুক্ত।

ধানক্ষেতে পাথর

২০১৯ সালের ২২ জুলাই ভারতের বিহারের মধুবনী জেলার মহাদেবা এলাকায় কৃষকেরা মাঠে কাজ করছিলেন। হঠাৎ দিনের আকাশে আগুনের গোলার মতো একটি বস্তু দেখা যায়। প্রচণ্ড শব্দের পর সেটি জলভরা ধানক্ষেতে এসে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়া উঠতেও দেখা যায়। পরে মাটি খুঁড়ে পাথরটি উদ্ধার করা হয়। এর ওজন ছিল প্রায় ১৫ কিলোগ্রাম।

পরবর্তী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, এটি সত্যিই একটি উল্কাপিণ্ড। এর নাম দেওয়া হয়, মহাদেবা। বিজ্ঞানীরা এটিকে অর্ডিনারি কনড্রাইট শ্রেণির উল্কাপিণ্ড হিসেবে শনাক্ত করেন।

উল্কা না উল্কাপিণ্ড?

দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়। মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো ছোট পাথুরে বা ধাতব বস্তুকে বলা হয় মিটিওরয়েড বা উল্কাবস্তু।

সেটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে প্রচণ্ড গতিতে উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে উঠলে আকাশে যে আলোর রেখা বা আগুনের গোলা দেখা যায়, সেটি হচ্ছে, মিটিওর বা উল্কা।

আর বস্তুটির কোনো অংশ বায়ুমণ্ডলের যাত্রা টিকে গিয়ে মাটিতে পৌঁছাতে পারলে সেটিই হলো, মিটিওরাইট বা উল্কাপিণ্ড।

প্রতিদিনই মহাকাশ থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র বস্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এদের অধিকাংশই খুব ছোট এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ক্ষয় হয়ে যায়। তাই কারও বাড়ির ছাদ, গাড়ি কিংবা শরীরে সরাসরি উল্কাপিণ্ড এসে পড়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। কিন্তু অসম্ভব নয়। ইতিহাসে ছড়িয়ে থাকা ঘটনাগুলো তারই সাক্ষী।

আর অস্ট্রেলিয়ার মারচিসন উল্কাপিণ্ড আমাদের সামনে আরও গভীর একটি প্রশ্ন রেখে গেছে, পৃথিবীতে জীবনের গল্প কি পুরোপুরি পৃথিবীতেই শুরু হয়েছিল, নাকি জীবনের কিছু রাসায়নিক উপাদান বহু আগে মহাকাশের পাথরের সাথে এখানে এসে পৌঁছেছিল?

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।