মহাকাশের লিফট
রকেট নেই। প্রচণ্ড কোন বিস্ফোরণও নেই। একটি লিফটে উঠে পৃথিবী থেকে সোজা চলে গেলেন মহাকাশে!
শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো হলেও এমনই এক স্পেস এলিভেটর তৈরির ধারণা নিয়ে কাজ করছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ওবায়াশি কর্পোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে তাদের মহাকাশ এলিভেটরের বিস্তারিত ধারণা প্রকাশ করে। লক্ষ্য ছিল, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তৈরি করা গেলে ২০৫০ সালের দিকে এটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
বিশাল কেবল
এটি অবশ্য কোনো আকাশচুম্বী ভবনের লিফট নয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী পৃথিবীর বিষুবীয় অঞ্চলের কাছাকাছি একটি বেস স্টেশন থেকে মহাকাশের দিকে প্রসারিত হবে প্রায় ৯৬ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কেবল। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে জিওস্টেশনারি কক্ষপথে থাকবে একটি মহাকাশ স্টেশন। কেবলটি সেখানেও শেষ হবে না। আরও অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে এর শেষ প্রান্তে থাকবে কাউন্টারওয়েট।
এই কেবলের ওপর দিয়েই চলবে বিশেষ বৈদ্যুতিক যান, ক্লাইম্বার। মানুষ ও মালামাল নিয়ে সেটি ধীরে ধীরে উঠে যাবে মহাকাশে।
কঠিন চ্যালেঞ্জ
কিন্তু এত লম্বা কেবল বানানো হবে কী দিয়ে?
ইস্পাত দিয়ে সম্ভব নয়। এত দীর্ঘ ইস্পাতের কেবল নিজের ওজনই বহন করতে পারবে না। তাই ওবায়াশির পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে অত্যন্ত হালকা ও শক্তিশালী কার্বন ন্যানোটিউব।
এখানেই স্পেস এলিভেটরের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বাধা। পরীক্ষাগারে কার্বন ন্যানোটিউব অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ, ত্রুটিমুক্ত এবং প্রয়োজনীয় শক্তির কেবল এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
ওবায়াশি কর্পোরেশন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের জাপানি পরীক্ষাগার ‘কিবো’-তেও কার্বন ন্যানোটিউবের নমুনা মহাকাশের পরিবেশে রেখে পরীক্ষা করেছে। সেখানে পারমাণবিক অক্সিজেনের কারণে উপাদানটির ক্ষতির চিহ্নও পাওয়া গেছে।
মহাকাশে পরীক্ষা
তারপরও গবেষণা থেমে নেই।
২০১৮ সালে জাপানের শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্স-মি মিশনে দুটি ক্ষুদ্র কিউবস্যাট ও একটি ক্লাইম্বার ব্যবহার করে অরবিটাল এলিভেটরের ধারণা পরীক্ষার চেষ্টা করা হয়। এটি পূর্ণাঙ্গ স্পেস এলিভেটর ছিল না; বরং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির একটি ছোট পরীক্ষামূলক ধাপ।
আরও বাধা
সমস্যা আরও আছে। মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ থেকে কেবলকে রক্ষা করতে হবে। সামলাতে হবে প্রবল বাতাস, বজ্রপাত ও কেবলের কম্পন। ক্লাইম্বারকে শক্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও হতে হবে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
তাই ২০৫০ সালকে নিশ্চিত উদ্বোধনের তারিখ ভাবার কারণ নেই। এটি ওবায়াশির বহু বছর আগে ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ স্পেস এলিভেটর নির্মাণ এখনো সম্ভব নয়।
নতুন যুগ
কিন্তু যদি কোনো দিন সম্ভব হয়?
তাহলে মহাকাশযাত্রার ধারণাটাই বদলে যেতে পারে। প্রতিবার বিশাল রকেট ও বিপুল জ্বালানি ব্যবহার না করে মানুষ ও মালামালকে কেবল বেয়ে মহাকাশে তোলা যাবে।
আরও ওপরে নিয়ে গিয়ে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে পাওয়া গতিকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশযান পাঠানো যেতে পারে চাঁদ, মঙ্গল কিংবা গ্রহাণুর দিকেও।
একসময় মানুষের চাঁদে যাওয়াও ছিল কল্পকাহিনির বিষয়। স্পেস এলিভেটরও কি একদিন তেমনই বাস্তব হয়ে উঠবে?
