মহাকর্ষের নতুন ভাষা
বিশ শতকের শুরুতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন মানুষের মহাবিশ্বকে দেখার ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আমাদের শিখিয়েছিল, স্থান আর কাল আলাদা কিছু নয়; তারা একসাথে মিলে তৈরি করে স্পেসটাইম। মহাকর্ষও কোনো অদৃশ্য বল নয়, বরং ভর ও শক্তির কারণে স্পেসটাইমের বক্রতাই হলো মহাকর্ষের আসল রূপ।
তাঁর এই ধারণা বলছে, পদার্থ ও শক্তি স্পেসটাইমকে বলে দেয় কীভাবে বাঁকতে হবে, আর সেই বাঁকানো স্পেসটাইম আবার পদার্থকে বলে দেয় কীভাবে চলতে হবে। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরা থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোলের জন্ম – সবকিছুই এই ধারণার ভেতরে ব্যাখ্যা করা যায়।
১৯১৯ সালে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন দেখিয়েছিলেন, সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নক্ষত্রের আলো সত্যিই বেঁকে যায়। সেই পর্যবেক্ষণই আইনস্টাইনকে বিশ্বজুড়ে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে।
কিন্তু এখানেই তিনি থেমে যাননি। জীবনের শেষ কয়েক দশক ধরে তিনি আরেকটি বিশাল স্বপ্নের পেছনে ছুটেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রকৃতির সব বলকে এক সূত্রে বাঁধা। সেটিই ছিল তাঁর “অসমাপ্ত কাজ”।
মহা ঐক্যের সন্ধানে
আইনস্টাইনের সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মূলত দুটি মৌলিক বলকে চিনতেন – মহাকর্ষ এবং তড়িৎচুম্বকত্ব। এর আগে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বকে একত্র করে দেখিয়েছিলেন, আলো আসলে একটি তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ। আইনস্টাইন ভাবলেন, যদি বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বকে একত্র করা যায়, তাহলে মহাকর্ষকেও কি একই গাণিতিক কাঠামোর ভেতরে আনা সম্ভব নয়?
তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির গভীরে নিশ্চয়ই এক ধরনের সৌন্দর্যময় ঐক্য লুকিয়ে আছে। মহাবিশ্ব এত বিশাল, এত সুশৃঙ্খল – এর নিয়মগুলোও হয়তো শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র মূল নীতিতে গিয়ে মিলবে।
এই ধারণাকেই বলা হয়, “ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি” বা একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব। আইনস্টাইনের স্বপ্ন ছিল এমন একটি তত্ত্ব খুঁজে বের করা, যেটা একই সাথে মহাকর্ষ ও তড়িৎচুম্বকত্বকে ব্যাখ্যা করবে। তাঁর কাছে মহাবিশ্ব ছিল যেন এক বিশাল সিম্ফনি, যেখানে সব বল একই গাণিতিক সুরে বাঁধা।
কোয়ান্টাম বিপ্লব
কিন্তু ঠিক সেই সময়ই জন্ম নিচ্ছিল আরেকটি বিপ্লব – কোয়ান্টাম মেকানিক্স। পরমাণুর জগতে দেখা গেল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। সেখানে সবকিছু অনিশ্চিত, সম্ভাবনাভিত্তিক এবং অদ্ভুত। ইলেকট্রন কোথায় আছে, সেটা নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। কণাগুলো কখনো কণার মতো, কখনো তরঙ্গের মতো আচরণ করে।
ভের্নার হাইজেনবার্গ দেখালেন, প্রকৃতির ভেতরেই এক ধরনের মৌলিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। অর্থাৎ, কোনো কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একই সাথে নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব নয়।
এই ধারণাগুলো আইনস্টাইনের খুব একটা পছন্দ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি মূলত সুশৃঙ্খল ও নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলে। সেজন্যই তিনি বিখ্যাত সেই মন্তব্য করেছিলেন:
“গড ডাজ নট প্লে ডাইস উইথ দ্য ইউনিভার্স।”
যদিও মজার ব্যাপার হলো, কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্মেও আইনস্টাইনের নিজের অবদান ছিল বিশাল। ১৯০৫ সালে তিনিই আলোর কোয়ান্টা বা ফোটনের ধারণা ব্যবহার করে ফটোইলেকট্রিক প্রভাব ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেই কাজের জন্যই তিনি পরে নোবেল পুরস্কার পান, আপেক্ষিকতার জন্য নয়।
একাকী সংগ্রাম
জীবনের শেষ ত্রিশ বছর আইনস্টাইন প্রায় একাই তাঁর ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি নিয়ে কাজ করে গেছেন। তখন পৃথিবীর অধিকাংশ তরুণ পদার্থবিদ কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আইনস্টাইন অন্য পথে হাঁটছিলেন।
প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের ছোট্ট অফিসে বসে তিনি প্রতিদিন সমীকরণ লিখতেন। কাগজের পর কাগজ ভরে যেত টেনসর, জ্যামিতি আর জটিল গাণিতিক প্রতীকে। সহকর্মীরা প্রায়ই দেখতেন, তিনি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে এসে আবার নতুন করে হিসেব শুরু করছেন।
কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান আর আসেনি। আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তাঁর অফিসের এলোমেলো ডেস্কের এই ছবিটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই ডেস্কে বসেই তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। কিন্তু ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি তাঁর কাছে অধরাই থেকে গেছে।
কঠিন সমস্যা
সমস্যা ছিল, তাঁর তত্ত্বে তখনো কোয়ান্টাম জগতকে পুরোপুরি যুক্ত করা যায়নি। পরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, প্রকৃতিতে শুধু দুটি নয়, চারটি মৌলিক বল রয়েছে – মহাকর্ষ, তড়িৎচুম্বকত্ব, শক্তিশালী নিউক্লীয় বল এবং দুর্বল নিউক্লীয় বল। আইনস্টাইনের সময় এগুলোর অনেক কিছুই অজানা ছিল।
আরেকটি বড় সমস্যা ছিল, জেনারেল রিলেটিভিটি একটি ধারাবাহিক ও মসৃণ স্পেসটাইম ধরে কাজ করে, কিন্তু কোয়ান্টাম জগৎ কাজ করে বিচ্ছিন্ন শক্তিস্তর ও সম্ভাবনার নিয়মে। এই দুই জগতকে একত্র করা এখনো পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি।
স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আইনস্টাইনের অসমাপ্ত স্বপ্ন এখনো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যগুলোর একটি। আজকের স্ট্রিং থিওরি বলছে, মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো আসলে বিন্দু নয়, ক্ষুদ্র কম্পনশীল স্ট্রিং। অন্যদিকে লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি চেষ্টা করছে স্পেসটাইমকেই কোয়ান্টাম কাঠামোর ভেতরে ব্যাখ্যা করতে। বিজ্ঞানীরা একটি “থিওরি অব এভরিথিং” খুঁজছেন – এটা এমন এক তত্ত্ব, যেটা একই সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং জেনারেল রিলেটিভিটিকে একত্র করতে পারবে।
মজার ব্যাপার হলো, আজকের আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানে তড়িৎচুম্বকত্ব এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলকে ইতিমধ্যেই একত্র করা হয়েছে। এটিই “ইলেকট্রোউইক থিওরি” নামে পরিচিত, যার জন্য স্টিভেন ওয়াইনবার্গ, আব্দুস সালাম এবং শেলডন গ্ল্যাশো নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রকৃতির বলগুলোর ঐক্যের স্বপ্ন পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
তবু মহাকর্ষ এখনো সেই মহা ঐক্যের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আইনস্টাইনের অসমাপ্ত কাজ তাই এখনো শেষ হয়নি। হয়তো কোনো একদিন ভবিষ্যতের কোনো তরুণ বিজ্ঞানী সেই রহস্যের দরজাটি খুলে ফেলবেন। তখন বোঝা যাবে, মহাবিশ্ব আসলেই কি একটিমাত্র গোপন সুরে বাঁধা, নাকি বাস্তবতা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত।
