মূল কন্টেন্টে যান
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › মহাকাশ বিজ্ঞান › ক্রিসালিস: নক্ষত্রযাত্রার নকশা

ক্রিসালিস: নক্ষত্রযাত্রার নকশা

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১৭ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
ক্রিসালিস: নক্ষত্রযাত্রার নকশা

পৃথিবী ছেড়ে যাত্রা করল এক বিশাল মহাকাশযান। গন্তব্য সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টোরিকে প্রদক্ষিণরত গ্রহ – প্রক্সিমা সেন্টোরি বি।

কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে লাগবে প্রায় ৪০০ বছর। পৃথিবী থেকে যাঁরা রওনা হবেন, তাঁদের কেউই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না। যাত্রাপথেই তাঁদের জীবন শেষ হয়ে যাবে।

মহাকাশযানে জন্ম নেবে নতুন প্রজন্ম। তারপর আরেক প্রজন্ম। কয়েক শতাব্দী পরে তাঁদেরই বংশধরেরা পৌঁছাবে অন্য এক নক্ষত্রের জগতে।

তবে এটি কোনো চলমান মহাকাশ অভিযান নয়। এমন এক কাল্পনিক নক্ষত্রযানের প্রস্তাবিত নকশার নাম – ‘ক্রিসালিস’।

রূপান্তরের নাম

‘ক্রিসালিস’ বলতে প্রজাপতি হওয়ার আগে শুঁয়োপোকার মূককীট বা পিউপা দশাকে বোঝায়। নামটি তাই বেশ অর্থবহ।

মহাকাশযানটির ভেতরে কয়েক শতাব্দী ধরে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বেড়ে উঠবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানবসমাজ। একদিন তাদের উত্তরসূরিরা সেই আবদ্ধ জগৎ থেকে বেরিয়ে নতুন কোনো গ্রহে জীবন শুরু করবে। যেমনটি ক্রিসালিস থেকে বেরিয়ে আসে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি।

২০২৫ সালে প্রজেক্ট হাইপেরিয়ন আয়োজিত জেনারেশন-শিপ নকশা প্রতিযোগিতায় ক্রিসালিস প্রথম স্থান অর্জন করে। নকশাটি তৈরি করেছে পাঁচ সদস্যের একটি ইতালীয় দল। তাদের পরিকল্পনায় শুধু প্রকৌশল নয়; স্থাপত্য, পরিবেশ, সামাজিক সংগঠন ও মানুষের মনস্তত্ত্বও স্থান পেয়েছে। বিচারকেরা নকশাটির সামগ্রিক সমন্বয়, মহাকাশে নির্মাণব্যবস্থা এবং অ্যান্টার্কটিকায় অভিযাত্রীদের প্রস্তুতির ধারণার বিশেষ প্রশংসা করেন।

বিশাল মহাযান

প্রস্তাবিত ক্রিসালিসের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ কিলোমিটার। এর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ২,৪০০ জন। তবে খাদ্য, বাসস্থান, জনসংখ্যা ও জিনগত বৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত জনসংখ্যা প্রায় ১,৫০০-এর মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

নলাকার মহাযানটির ভেতরে থাকবে ঘূর্ণমান আবাসিক স্তর। এই ঘূর্ণন থেকে তৈরি হবে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ। ফলে বাসিন্দারা মেঝেতে দাঁড়িয়ে হাঁটাচলা করতে পারবেন। তবে এটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের নিখুঁত বিকল্প হবে কি না, সেটা নির্ভর করবে স্তরগুলোর ব্যাস ও ঘূর্ণনগতির ওপর।

মহাকাশে জনপদ

ক্রিসালিস শুধু একটি মহাকাশযান নয়। এটি হবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাসমান জনপদ। এর ভেতরে একটির মধ্যে আরেকটি বসানো পাঁচটি বিশাল স্তর থাকবে। কোনো স্তরে হবে চাষাবাদ ও খাদ্য উৎপাদন। কোথাও থাকবে বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, পার্ক ও বিনোদনের ব্যবস্থা। অন্য স্তরে থাকবে কারখানা, গুদাম এবং যন্ত্রপাতি তৈরি ও মেরামতের সুবিধা।

গাছপালা, ছত্রাক, অণুজীব, পোকামাকড় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রাণীও সঙ্গে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পানি, বাতাস, পুষ্টি উপাদান ও বর্জ্য বারবার পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহার করতে হবে। কারণ যাত্রা শুরু হওয়ার পর পৃথিবী থেকে নিয়মিত রসদ পাঠানোর কোনো সুযোগ থাকবে না।

চারশ বছরের পথ

ক্রিসালিসের প্রস্তাবিত গন্তব্য প্রক্সিমা সেন্টোরি বি। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহটি আমাদের সবচেয়ে কাছের পরিচিত বহির্গ্রহ।

গ্রহটি তার নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে রয়েছে। অর্থাৎ উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল থাকলে সেখানে তরল পানি থাকার মতো তাপমাত্রা থাকতে পারে। কিন্তু গ্রহটিতে আদৌ বায়ুমণ্ডল, তরল পানি কিংবা প্রাণের উপযোগী পরিবেশ আছে কি না, সেটা এখনো জানা যায়নি।

প্রক্সিমা সেন্টোরি একটি সক্রিয় লাল বামন নক্ষত্র। এর শক্তিশালী বিকিরণ ও নাক্ষত্রিক অগ্ন্যুৎপাত গ্রহটির পরিবেশকে প্রতিকূল করে তুলতে পারে।

মহাযানটি চালানোর জন্য ডিউটেরিয়াম ও হিলিয়াম-৩ জ্বালানিনির্ভর ফিউশন ইঞ্জিনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মহাকাশযান চালানোর মতো শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ফিউশন ইঞ্জিন এখনো তৈরি হয়নি। তাই ৪০০ বছরের যাত্রার হিসাবও ভবিষ্যতের অনাবিষ্কৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

কঠিন প্রশ্ন

এই অভিযানের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু প্রযুক্তি নয়। কয়েক শতাব্দী ধরে একটি বদ্ধ মানবসমাজ কীভাবে স্থিতিশীল থাকবে, সেটিই সম্ভবত আরও কঠিন প্রশ্ন।

কারা সন্তান নিতে পারবেন? জনসংখ্যা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে? আইন ও নেতৃত্বের ধরন কেমন হবে? পৃথিবীর ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে? আর মহাকাশযানেই জন্ম নেওয়া মানুষ কেন এমন একটি গ্রহে যেতে চাইবে, যেটা তারা কখনো দেখেনি?

ক্রিসালিসের নকশায় তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান সংরক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিকের অভিযাত্রীদের অ্যান্টার্কটিকার বিচ্ছিন্ন পরিবেশে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

দূরের স্বপ্ন

ক্রিসালিস নির্মাণের কোনো বাস্তব পরিকল্পনা এখনো নেই। প্রয়োজনীয় ফিউশন ইঞ্জিন, শতাব্দীব্যাপী নির্ভরযোগ্য যন্ত্র এবং সম্পূর্ণ বদ্ধ জীবনধারণব্যবস্থা, এর কোনোটিই এখন আমাদের হাতে নেই।

প্রজেক্ট হাইপেরিয়নের উদ্দেশ্যও এখনই মানুষকে অন্য নক্ষত্রে পাঠানো নয়। এর লক্ষ্য হলো বর্তমান ও নিকট-ভবিষ্যতের প্রযুক্তি দিয়ে বহু প্রজন্মের নক্ষত্রযাত্রা কতটা সম্ভব, সেটা যাচাই করা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার প্রয়োজনগুলো চিহ্নিত করা।

ক্রিসালিসের গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই। এটি মনে করিয়ে দেয়, অন্য নক্ষত্রে মানুষ পাঠাতে শুধু শক্তিশালী ইঞ্জিনই যথেষ্ট নয়। সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে একটি টেকসই মানব সমাজ, জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র এবং মানবসভ্যতার জ্ঞান ও স্মৃতি।

অন্য নক্ষত্রের কাছে পৌঁছানোর আগে মানুষকে তাই শিখতে হবে, মহাশূন্যের বুকে ছোট্ট একটি কৃত্রিম পৃথিবীকে শত শত বছর কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়। ক্রিসালিস আপাতত সেই সুদূর স্বপ্নেরই একটি বিশাল নকশা।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।