মূল কন্টেন্টে যান
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › মহাকাশ বিজ্ঞান › মঙ্গল যাত্রা

মঙ্গল যাত্রা

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

⏱ ৬ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১১ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
মঙ্গল যাত্রা

চাঁদে মানুষ প্রথম পা রেখেছিল ১৯৬৯ সালে। এবার লক্ষ্য আরও অনেক দূরে – মঙ্গলগ্রহে। মানুষ কবে পা রাখবে মঙ্গলের মাটিতে?

নাসার লক্ষ্য, ২০৩০-এর দশক থেকেই মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর সক্ষমতা তৈরি করা। তবে প্রথম মানুষ ঠিক কোন বছরে মঙ্গলে নামবে, সেই নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

কাজটি যে কত কঠিন, সেটা বোঝা যায় মঙ্গলে অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাস থেকে।

ল্যান্ডার আর রোভার

মানুষ এখনো মঙ্গলে যায়নি। কিন্তু মানুষের তৈরি ল্যান্ডার আর রোভার সেখানে পৌঁছেছে বহুবার।

মঙ্গল অভিযানে প্রথম সাফল্য আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ধরে। ১৯৭১ সালে মার্স-৩ মঙ্গলের মাটিতে সফলভাবে সফট ল্যান্ডিং করে। তবে অবতরণের মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এরপর মঙ্গল অভিযানে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পায় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৬ সালে নাসার ভাইকিং-১ ও ভাইকিং-২ সফলভাবে মঙ্গলে নামে। ১৯৯৭ সালে পাথফাইন্ডারের সঙ্গে যায় সোজার্নার, মঙ্গলের বুকে চলা প্রথম রোভার।

এরপর আসে স্পিরিট ও অপরচুনিটি। এ দুটো রোভার মঙ্গলের অতীতে তরল পানির উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ খুঁজে পায়।

২০১২ সালে নামে কিউরিওসিটি রোভার। ২০১৮ সালে ইনসাইট মঙ্গলের ভূকম্পন ও অভ্যন্তরীণ গঠন নিয়ে গবেষণা শুরু করে।

২০২১ সালে নামে পারসিভিয়ারেন্স। এই রোভারের সঙ্গে থাকা ছোট্ট হেলিকপ্টার ইনজেনুইটি মঙ্গল গ্রহে প্রথম নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়নের ইতিহাস সৃষ্টি করে।

অন্যরাও পিছিয়ে নেই

মঙ্গল অভিযান এখন আর শুধু আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মার্স এক্সপ্রেস ২০০৩ সাল থেকে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে পর্যবেক্ষণ করছে। ২০১৬ সালে এক্সোমার্স ট্রেস গ্যাস অরবিটার মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছে বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণা শুরু করে। তবে বিগল-২ ও শিয়াপারেলি – এ দু’টি ইউরোপীয় ল্যান্ডারের কোনটিই সফল হয়নি। ইউরোপিয়ান মহাকাশ সংস্থার পরবর্তী লক্ষ্য, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভার, যেটা ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারতের মঙ্গলযান ২০১৪ সালে প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফলভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে। এটি ছিল ভারতের প্রথম আন্তঃগ্রহ অভিযান।

২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হোপ মহাকাশযানও মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছে যায়।

একই বছর চীনের তিয়ানওয়েন-১ মিশন মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে। পরে এর ল্যান্ডার সফলভাবে মঙ্গলে নামে এবং ঝুরং রোভার মঙ্গলের বুকে চলাচল শুরু করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীনই প্রথম দেশ, যারা সফলভাবে মঙ্গলে একটি রোভার পরিচালনা করেছে।

অর্থাৎ মানুষ যাওয়ার বহু আগেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মহাকাশযান মঙ্গলে মানুষের জন্য পথ তৈরি করছে।

মঙ্গল কত দূরে?

মঙ্গল পৃথিবীর পাশের গ্রহ হলেও এর দূরত্ব স্থির নয়। পৃথিবী ও মঙ্গল দুটিই সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, কিন্তু ভিন্ন কক্ষপথে এবং ভিন্ন গতিতে।

সবচেয়ে কাছে এলে দুই গ্রহের দূরত্ব প্রায় ৫ কোটি ৪৬ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। আবার সূর্যের দুই পাশে অবস্থান করলে দূরত্ব বেড়ে হতে পারে প্রায় ৪০ কোটি কিলোমিটার।

তাই “মঙ্গল পৃথিবী থেকে কত দূরে?” এই প্রশ্নের কোন সরল উত্তর নেই। দুই গ্রহের কক্ষপথ বিবেচনা করলে পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যকার দূরত্ব সময়ের সঙ্গে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে।

এই বিশাল দূরত্বের আরেকটি সমস্যা হলো বেতার যোগাযোগ। মঙ্গল সবচেয়ে কাছে থাকলেও পৃথিবী থেকে পাঠানো একটি রেডিও সংকেত সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ৩ মিনিট লাগে। সবচেয়ে দূরে থাকলে একদিকে সংকেত পৌঁছাতেই সময় লাগতে পারে ২২ মিনিটের বেশি।

অর্থাৎ মঙ্গলে কোনো বিপদ ঘটলে পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোল সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিতে পারবে না।

দীর্ঘ যাত্রা

পৃথিবী ও মঙ্গল সূর্যকে ভিন্ন গতিতে প্রদক্ষিণ করায় প্রায় ২৬ মাস পরপর এমন একটি সুযোগ আসে, যখন তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যবহার করে মঙ্গলের দিকে মহাকাশযান পাঠানো যায়। একে বলা হয়, লঞ্চ উইন্ডো। এই কারণেই মঙ্গল অভিযান যখন-তখন পাঠানো হয় না।

বর্তমান রকেট প্রযুক্তিতে মঙ্গলে যেতে সাধারণত কয়েক মাস লাগে। পারসিভিয়ারেন্সের যাত্রায় সময় লেগেছিল প্রায় সাত মাস। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে পুরো অভিযান দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

চাঁদে প্রস্তুতি

মানুষের মঙ্গলযাত্রার প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চাঁদ।

নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির মাধ্যমে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে মানুষ কীভাবে দীর্ঘদিন থাকবে ও কাজ করবে, সেই প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হচ্ছে। চাঁদে যাওয়ার অভিজ্ঞতার অনেকটাই ভবিষ্যতে কাজে লাগবে মঙ্গলে।

স্পেসএক্সের লক্ষ্য

মঙ্গলযাত্রায় সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের। তাদের বিশাল স্টারশিপ তৈরি করা হচ্ছে মানুষ ও বিপুল পরিমাণ মালামাল মঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। স্পেসএক্সের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গলের মাটিতে স্টারশিপের কার্গো মিশন ২০২৮ সালের আগে শুরু হবে না। মানুষের আগে সেখানে পাঠানো হবে সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।

দীর্ঘমেয়াদে স্পেসএক্সের লক্ষ্য মঙ্গলে একটি স্বনির্ভর মানব বসতি গড়ে তোলা। এজন্য স্টারশিপকে পুরোপুরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা, পৃথিবীর কক্ষপথে জ্বালানি ভরা এবং মঙ্গলের সম্পদ থেকেই মিথেন ও অক্সিজেন জ্বালানি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

অদৃশ্য বিপদ

মঙ্গলযাত্রার অন্যতম বড় সমস্যা মহাজাগতিক বিকিরণ। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র আমাদের অনেকটা সুরক্ষা দেয়। কিন্তু গভীর মহাকাশে সেই সুরক্ষা থাকবে না।

দীর্ঘ সময় ওজনহীন অবস্থায় থাকলে হাড় ও পেশিও দুর্বল হয়ে পড়ে। সঙ্গে থাকবে সীমিত খাবার ও পানি, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক চাপ। আর বিপদে পড়লে দ্রুত পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ নেই।

কঠিন অবতরণ

মঙ্গলে পৌঁছালেই কাজ শেষ নয়। সেখানে নামাটাও কঠিন। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত পাতলা। তাই শুধু প্যারাসুট দিয়ে বিশাল মানববাহী মহাকাশযান নামানো যাবে না।

প্রায় এক টন ওজনের কিউরিওসিটি ও পারসিভিয়ারেন্স নামাতেই ব্যবহার করতে হয়েছে জটিল স্কাই ক্রেন ব্যবস্থা। স্কাই ক্রেন হলো রকেটচালিত একটি স্বয়ংক্রিয় উড়ন্ত প্ল্যাটফর্ম, যেটা তারের সাহায্যে ভারী রোভারকে ধীরে ধীরে মঙ্গলের মাটিতে নামিয়ে দেয়।

মানুষ, বাসস্থান, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ ভবিষ্যতের মহাকাশযান হবে আরও অনেক ভারী। এত ভারী মহাকাশযান মঙ্গলের বুকে নিরাপদে অবতরণ করানো হবে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ।

অক্সিজেনের কারখানা

মঙ্গলে মানুষকে বেঁচেও থাকতে হবে। এজন্য প্রথমেই দরকার হবে অক্সিজেনের সরবরাহ। অবশ্য এক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সফল হয়েছে।

পারসিভিয়ারেন্সের সঙ্গে পাঠানো মক্সি (MOXIE) ছিল ছোট একটি পরীক্ষামূলক ‘অক্সিজেন কারখানা’। এটি মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ বাতাস থেকে অক্সিজেন তৈরি করে প্রমাণ করেছে ভবিষ্যতের নভোচারীদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের একটি অংশ মঙ্গলেই তৈরি করা সম্ভব।

ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির অনেক বড় সংস্করণ নভোচারীদের শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন এবং রকেটের অক্সিডাইজার তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সবকিছু নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মঙ্গলের নিজস্ব সম্পদও ব্যবহার করতে হবে।

মানুষের অবতরণ

নাসা বলছে, ২০৩০-এর দশক থেকেই মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট অবতরণের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

তার আগে প্রমাণ করতে হবে, মানুষকে দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় নিরাপদ রাখা যাবে, বিশাল মহাকাশযান মঙ্গলে নামানো যাবে, সেখানে মানুষ বেঁচে বর্তে থাকতে পারবে এবং আবার নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরতেও পারবে।

কারণ মঙ্গল অভিযানের সাফল্য শুধু সেখানে পৌঁছানো নয়।

মানুষকে মঙ্গলে নামতে হবে। সেখানে বেঁচে থাকতে হবে। কাজ করতে হবে। তারপর আবার মঙ্গল থেকে উৎক্ষেপণ করে ফিরে আসতে হবে পৃথিবীতে। সেটি সম্ভব হলে মানবসভ্যতার ইতিহাসে শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়। মানুষ তখন আর শুধু পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে থাকবে না। হয়ে উঠবে দুই ভুবনের অভিযাত্রী।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।