মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাবিজ্ঞানীদের কথারামানুজনের লস্ট নোটবুক: গণিত থেকে ব্ল্যাকহোল…

রামানুজনের লস্ট নোটবুক: গণিত থেকে ব্ল্যাকহোল রহস্য

২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

⏱ ২ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১৮৫ 💬 ০
রামানুজনের লস্ট নোটবুক: গণিত থেকে ব্ল্যাকহোল রহস্য

প্রতিভার অকাল প্রস্থান ও গোপন খাতা

১৯২০ সালের জানুয়ারি মাস। কেমব্রিজের কুয়াশাচ্ছন্ন এক সকালে পৃথিবী হারাল গণিতের বরপুত্র শ্রীনিবাস রামানুজনকে। মাত্র ৩২ বছর বয়সে নিভে গেল এক কিংবদন্তি প্রতিভার প্রদীপ।

তাঁর অকালমৃত্যুর পর, ব্যক্তিগত নথিপত্রের ভেতরে খুঁজে পাওয়া গেল হাতে লেখা জটিল সব গাণিতিক সমীকরণে ভরা একটি খাতা, যেটা পরবর্তীতে রামানুজনের লস্ট নোটবুক নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। এই লস্ট নোটবুকের বিষয়বস্তু প্রথমে ছিল রহস্যঘেরা। তবে ১৯৭৬ সালে গণিতবিদ জর্জ অ্যান্ড্রুজ যখন ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে বসে রামানুজনের সংরক্ষিত নথিপত্র ঘাঁটছিলেন, তখন নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয় এই অমূল্য খাতা।

মক থেটা ফাংশন: এক দুর্বোধ্য ধাঁধা

এই খাতায় রামানুজন বর্ণনা করেন এমন এক গাণিতিক ফাংশনের কথা, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন “মক থেটা ফাংশন”। আধুনিক গণিতে এদের বলা হয় “মক মডুলার ফর্ম”। এতে ছিল এমন সব অঙ্কের সূত্র, যেগুলোর ভাষা ছিল জটিল অথচ সৌন্দর্যময়।

সেই সময়ে এই ফাংশনের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে ওঠেনি, ফলে রামানুজনের এই লেখাগুলোর ব্যাখ্যা তখনকার দিনে কোনো গণিতজ্ঞই স্পষ্টভাবে দিতে পারেননি। দীর্ঘকাল পর, ২০০২ সালে ডন জাগার, সান্ডার রাজন, কেন ওনো ও ক্যাথরিন ব্রিংম্যান প্রমুখ গণিতবিদ মিলে এই মক মডুলার ফর্মের গাণিতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা দেখান, এই ফর্মগুলো আসলে “হারমোনিক মাস ফর্ম”-এর অংশ।

ব্ল্যাকহোল রহস্য সমাধানে রামানুজন

এরপর আসে এক বিস্ময়কর সংযোগ। স্ট্রিং থিওরি এবং ব্ল্যাকহোল এনট্রপির মতো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, কিছু সুপারসিমেট্রিক ব্ল্যাকহোলের “মাইক্রোস্টেট” গণনার সময় যে পার্টিশন ফাংশন ব্যবহৃত হয়, সেটা অনেকাংশেই রামানুজনের সেই মক মডুলার ফর্মের সঙ্গে মিলে যায়।

বিশেষ করে, অতীশ দাভোলকর এবং সামীর মুর্তির গবেষণায় দেখা যায়, “এন = ৪ সুপারসিমেট্রিক ব্ল্যাকহোল” সম্পর্কিত সমস্যায় রামানুজনের সূত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভাবতেই অবাক লাগে, এক শতাব্দী আগে এক স্বশিক্ষিত গণিত সাধকের খাতায় লিখে রাখা ফর্মুলাগুলো আজ ব্যবহার করা হচ্ছে মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় ব্ল্যাকহোলের রহস্যের জট খুলতে।

উপসংহার ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

রামানুজনের লস্ট নোটবুক আর “মক মডুলার ফর্ম”-এর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণিত শুধুমাত্র সংখ্যার মারপ্যাঁচ নয়। বরং এটি এমন একটি সূক্ষ্ম ভাষা, যার প্রতিটি ছন্দে জড়িয়ে আছে মহাবিশ্বের গভীরতম সত্যের ইঙ্গিত।

গতকাল ২২ ডিসেম্বর ছিল এই অসাধারণ গণিত সাধকের জন্মদিন। ১৮৮৭ সালের এই দিনে তিনি ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *