ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা। একজন বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকানের উদ্বোধনী Young American Scientists তালিকায় স্থান পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিভিন্ন শাখার মাত্র ২৮ জন উদীয়মান গবেষকের মধ্যে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এই তালিকা তৈরিতে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ, গবেষণাপত্রের প্রভাব এবং বৈজ্ঞানিক অবদানের মতো একাধিক মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে।
ঢাকার অসংখ্য শিশুর মতো তিনিও বড় হয়েছেন লোডশেডিংয়ের সঙ্গে। কিন্তু সেই অন্ধকারকে তিনি বিরক্তির কারণ হিসেবে দেখেননি। বরং বিদ্যুৎহীন রাতের আকাশে অসংখ্য তারা দেখে জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্ন- মহাবিশ্বকে জানার স্বপ্ন।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মঙ্গল গ্রহে মহাকাশ অভিযানের খবর শুনে তাঁর মনে জন্মেছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার ইচ্ছে। পরে সেই ইচ্ছেটাই তাঁকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ব্রিন মার কলেজে, যেখানে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। এরপর বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ডার্টমাউথ কলেজ ও ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোতে পোস্টডক্টরাল গবেষণার পর তিনি বর্তমানে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে গবেষণা ও শিক্ষকতায় নিয়োজিত।
ড. তনিমা তাসনিম অনন্যার গবেষণার মূল বিষয় মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর একটি, যার নাম – সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল। প্রায় প্রতিটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই এমন একটি দানবীয় ব্ল্যাক হোল রয়েছে। আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের কেন্দ্রেও এরকম একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে।
এদের ভর সূর্যের ভরের লক্ষ থেকে শতকোটি গুণ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু এদের অনেকই ঘন মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাসের বিশাল মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। তাই সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে তাদের খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
এই কঠিন সমস্যার সমাধানেই ড. তনিমা ও তাঁর সহকর্মীরা তৈরি করেছেন নতুন বিশ্লেষণ কৌশল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক পরিসংখ্যান এবং দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত রশ্মি ও এক্স-রে পর্যবেক্ষণের তথ্য একত্র করে তাঁরা মহাবিশ্বের এক ত্রিমাত্রিক চিত্র নির্মাণ করেন। এর সাহায্যে ধূলিকণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বহু সক্রিয় গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস (AGN) এবং সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই গবেষণা বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করছে কীভাবে ব্ল্যাক হোল এবং তাদের আশপাশের গ্যালাক্সি কোটি কোটি বছর ধরে একসঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে।
তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি নতুন নয়। ২০২০ সালেই Science News তাঁকে Scientists to Watch তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এছাড়া তিনি নাসাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার ফেলোশিপ ও অনুদান পেয়েছেন।
ড. তনিমা তাসনিম অনন্যার গল্প কেবল একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই জন্ম হোক, কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং স্বপ্ন থাকলে মানুষের গন্তব্য হতে পারে মহাবিশ্বের সবচেয়ে অন্ধকার কোণও।
বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের জন্য তাঁর বার্তাটি যেন একেবারেই স্পষ্ট- স্বপ্ন দেখার জন্য আকাশের কোনো সীমানা নেই।
তথ্যসূত্র: সাইন্টিফিক আমেরিকান
