চাঁদে রকেটের সংঘর্ষ
আগামী ৫ আগস্ট চাঁদের বুকে ঘটতে যাচ্ছে একটি ব্যতিক্রমী সংঘর্ষ। তবে এটি কোনো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর আঘাত নয়। এবার চাঁদে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে মানুষের তৈরি একটি রকেটের অংশ।
কী ঘটতে যাচ্ছে?
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি চাঁদে একটি ল্যান্ডার উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহৃত স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের উপরের অংশটি মহাকাশেই থেকে যায়। পে-লোড নির্ধারিত পথে পাঠানোর পর রকেটের আপার স্টেজে পৃথিবীতে ফিরে আসার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি অবশিষ্ট ছিল না। ফলে সেটি পৃথিবী ও চাঁদের মহাকর্ষের প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, রকেটের এই অংশটি আগামী ৫ আগস্ট চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত হানতে পারে।
কতটা শক্তিশালী হবে এই সংঘর্ষ?
প্রায় ৩.৯ টন ওজনের এই রকেটের অংশটি চাঁদে আঘাত করবে ঘণ্টায় প্রায় ৮,৭০০ কিলোমিটার বেগে। এতে প্রবল সংঘর্ষে চাঁদের মাটিতে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ মিটার ব্যাসের একটি নতুন গর্ত তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধুলো ও পাথরের সূক্ষ্ম কণা চারদিকে ছিটকে পড়বে।
পৃথিবী থেকে কী দেখা যাবে?
শুনতে ঘটনাটি নাটকীয় মনে হলেও পৃথিবীর মানুষের জন্য এতে কোনো ঝুঁকি নেই। সংঘর্ষের মুহূর্তের ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলকানি খালি চোখে দেখা যাবে না। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অবজারভেটরির শক্তিশালী টেলিস্কোপ এবং চাঁদের কক্ষপথে থাকা কয়েকটি মহাকাশযান ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করবে।
পর্যবেক্ষণ সফল হলে বিজ্ঞানীরা সংঘর্ষে সৃষ্টি হওয়া ধুলোর মেঘ, নতুন গর্ত এবং চাঁদের মাটির প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। তাই এটি শুধু একটি সংঘর্ষ নয়, বরং একটি বিরল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।
এমন ঘটনা কি আগে ঘটেছে?
চাঁদে সংঘর্ষের ঘটনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রতিনিয়ত ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ড ও গ্রহাণু চাঁদের বুকে আঘাত হানে। পৃথিবী থেকে শক্তিশালী টেলিস্কোপে এমন অনেক সংঘর্ষের ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলকানিও দেখা গেছে। ২০১৩ সালে একটি বড় উল্কাপিণ্ডের আঘাতে সৃষ্টি হওয়া বিস্ফোরণের আলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে কয়েক মুহূর্তের জন্য সেটি খালি চোখেও দেখা গিয়েছিল।
তবে এবারের ঘটনাটি ভিন্ন। কারণ এটি কোনো প্রাকৃতিক বস্তু নয়, মানুষের তৈরি একটি রকেটের অংশ। তাছাড়া বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানেন কখন, কোথায় এবং কত গতিতে সংঘর্ষটি ঘটবে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অবজারভেটরি আগে থেকেই তাদের টেলিস্কোপ সেই জায়গায় তাক করে রাখতে পারবে। চাঁদের বুকে এমন পূর্বনির্ধারিত সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণের সুযোগ অত্যন্ত বিরল।
চাঁদে মানুষের আরেকটি চিহ্ন
কোটি কোটি বছর ধরে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাতে চাঁদের পৃষ্ঠ অসংখ্য ক্ষতচিহ্নে ভরে গেছে। এবার সেই দীর্ঘ তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছে মানুষের তৈরি আরেকটি নতুন চিহ্ন।
চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্নের ইতিহাস শুরু হয়েছিল অ্যাপোলো অভিযানের মাধ্যমে। এবার সেখানে যোগ হতে যাচ্ছে মানুষের তৈরি আরেকটি চিহ্ন। তবে এবার পদচিহ্ন নয়, একটি পরিত্যক্ত রকেটের আঘাতে সৃষ্টি হওয়া নতুন একটি গর্ত।
মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে এটি হয়তো খুব বড় কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদের বুকে পূর্ব নির্ধারিত সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণ করা একটি বিরল সুযোগ।
