ড: জিম পিকক: অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানের উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়
অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। ড: জিম পিকক ছিলেন সেই মানুষ, যিনি শুধু একজন বিজ্ঞানীই নন, তিনি ছিলেন এক দিকনির্দেশক, একজন চিন্তাশীল নেতৃত্ব, যিনি অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানচর্চাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স (AAS)-এর একজন বিশিষ্ট ফেলো হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন। এছাড়াও, ১৯৮৮ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব টেকনোলজিক্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ATSE)-এর ফেলো নির্বাচিত হন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য দেশ ও বিদেশ থেকে তিনি অগণিত সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮২ সালে তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন- যেটা সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিরল স্বীকৃতি। ১৯৯০ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ফরেন অ্যাসোসিয়েট নির্বাচিত হন, একই বছরে ভারতের ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমিও তাঁকে ফেলো হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৪ সালে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান- কম্প্যানিয়ন অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া (AC) পদকে ভূষিত করা হয়। এটি ছিল বিজ্ঞানে তাঁর অনন্য অবদানের প্রতি অস্ট্রেলিয়ান জনগণের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
ড: পিককের বৈজ্ঞানিক জীবন ছিল এক বিরল যাত্রা। তিনি মূলত উদ্ভিদ জিনতত্ত্ব এবং কোষবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতেন। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি যোগ দেন CSIRO-এর উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে, যেখানে তিনি কয়েক দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন নানা বৈপ্লবিক গবেষণায়। তাঁর নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়ায় উন্নয়ন করা হয় কীটপ্রতিরোধী তুলা (insect-resistant cotton) যেটা কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে, কীটনাশকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এছাড়াও তিনি কাজ করেছেন উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ও নিম্ন গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত বার্লির জাত উদ্ভাবনে, যেটা খাদ্য ও স্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু তাঁর অবদান শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। তাঁর উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল “Primary Connections” ও “Scientists in Schools” নামের দুটি জাতীয় কর্মসূচি, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন- একটি সমাজে বিজ্ঞান তখনই বিকশিত হয়, যখন শিশুরা কৌতূহল থেকে প্রশ্ন করতে শেখে, এবং শিক্ষকরা সেই কৌতূহলকে জাগিয়ে রাখতে পারেন।
২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি Chief Scientist of Australia হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি ফেডারেল সরকারকে গবেষণা, শিক্ষা ও উদ্ভাবন নীতিমালা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন এবং এ দেশের বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার ফলেই অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত অবস্থানে পৌঁছেছে।
ড: জিম পিকক ছিলেন এমন এক বিরল ব্যক্তি, যিনি গবেষণাকে কেবল ল্যাবরেটরির চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে, সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের সেই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে যায়। তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার, তাঁর প্রজ্ঞা আর উদ্ভাবনী চেতনা-আগামী প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে।
গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ড: জিম পিকককে – যিনি ছিলেন একজন প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ এবং বিজ্ঞানীদের জন্য এক অবিচল প্রেরণার উৎস।
