চেতনার কি মৃত্যু হয়?
মৃত্যু মানেই কি সবকিছু শেষ? প্রশ্নটি হাজার বছরের পুরোনো। ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্য এর নানা ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে প্রশ্নটি একটু অন্য রকম, আমাদের চেতনা আসলে কী? আর মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে চেতনার কী হয়? আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা এখনো প্রথম প্রশ্নটিরই পূর্ণ উত্তর জানি না।
বাস্তবতা আসলে অদ্ভুত
গত একশ বছরে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা আমাদের দেখিয়েছে, অতিক্ষুদ্র জগৎ আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার নিয়ম মেনে চলে না।
একটি কোয়ান্টাম ব্যবস্থা একই সঙ্গে একাধিক সম্ভাব্য অবস্থার সমন্বয়ে থাকতে পারে। একে বলা হয়, সুপারপজিশন। আবার দুটি কণা এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে যে তাদের কোয়ান্টাম অবস্থাকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে বর্ণনা করা যায় না। একে বলা হয়, কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট। এনট্যাঙ্গলমেন্ট যে প্রকৃতির বাস্তব বৈশিষ্ট্য, দীর্ঘ পরীক্ষার ফলে সেটা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কাজের জন্য ২০২২ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে অ্যালাঁ আসপে, জন ক্লজার ও আন্তন সাইলিঙ্গারকে।
আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কোয়ান্টাম জগতে আমরা কোন বৈশিষ্ট্যটি মাপছি এবং পরীক্ষাটি কীভাবে সাজানো হয়েছে, তার সাথে প্রাপ্ত ফলাফলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ডাবল-স্লিট পরীক্ষায় এর চমৎকার উদাহরণ দেখা যায়।
তবে এখানে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। এর অর্থ এই নয় যে মানুষের চেতনার কারণেই বাস্তবতা তৈরি হয়ে যায়। কোয়ান্টাম মাপজোখের জন্য সচেতন মানুষের উপস্থিতি প্রয়োজন, এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।
চেতনার চাবিকাঠি
এখানেই শুরু হয়েছে আরও আকর্ষণীয় বিতর্ক। আমরা জানি, মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চেতনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু কোটি কোটি নিউরনের বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক কার্যকলাপ থেকে কীভাবে জন্ম নেয় আমাদের ভেতরের এই ব্যক্তিগত অনুভূতি? আমি কেন আমি? লাল রং দেখলে “লাল” অনুভব করি কীভাবে? ব্যথা শুধু স্নায়ুর সংকেত না হয়ে অনুভূতিতে পরিণত হয় কেন?
বিজ্ঞান এখনো এসব প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দিতে পারেনি। চেতনা ব্যাখ্যা করার জন্য গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস, ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন, প্রেডিক্টিভ প্রসেসিংসহ বিভিন্ন তত্ত্ব রয়েছে; কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়ে ওঠেনি।
এই অমীমাংসিত জায়গা থেকেই কিছু গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন, মস্তিষ্কের ভেতরে কি এমন কোনো কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে, যেটা চেতনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ?
পেনরোজের বিতর্কিত ধারণা
নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রজার পেনরোজ এবং অ্যানেসথেসিওলজিস্ট স্টুয়ার্ট হ্যামেরফ এ বিষয়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি ধারণা দিয়েছেন। তাঁদের এই ধারণাটির নাম “অর্কেস্ট্রেটেড অবজেক্টিভ রিডাকশন” বা সংক্ষেপে Orch-OR।
তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, নিউরনের ভেতরের মাইক্রোটিউবিউল নামের ক্ষুদ্র কাঠামোয় বিশেষ ধরনের কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া চেতনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
ধারণাটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। মস্তিষ্কে চেতনা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া কাজ করে কি না, সেটি এক প্রশ্ন; আর সেই প্রক্রিয়াই আমাদের চেতনার মূল উৎস কি না, সেটি আরও বড় প্রশ্ন। বর্তমান গবেষণায় কোয়ান্টাম-চেতনা সম্পর্কিত তত্ত্বগুলো এখনো বিতর্কিত এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরীক্ষামূলক প্রমাণের অভাব রয়েছে।
তাহলে মৃত্যুর পর কী হয়?
আর ঠিক এখানেই আসে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নটি। কেউ কেউ বলেন, যদি চেতনার সঙ্গে কোয়ান্টাম জগতের সম্পর্ক থাকে, তাহলে হয়তো মস্তিষ্ক মারা গেলেও চেতনা টিকে থাকতে পারে।
শুনতে বেশ লাগে। কিন্তু এখানেই বিজ্ঞানের সীমারেখা টেনে দেওয়া দরকার। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ দেয়নি যে মানুষের চেতনা মৃত্যুর পরও টিকে থাকে।
সুপারপজিশন আছে। কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট আছে। কোয়ান্টাম জগৎ সত্যিই অদ্ভুত। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই প্রমাণ করে না যে মানুষের স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব বা “আমিত্ব” মৃত্যুর পর কোনো কোয়ান্টাম অবস্থায় থেকে যায়।
এ ধরনের ধারণা এখনো মূলত অনুমাননির্ভর। মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত চেতনা টিকে থাকার পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রহস্যটা থেকেই যাচ্ছে
তারপরও প্রশ্নটিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এখানে সবচেয়ে বড় অজানা বিষয়টি কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নয়। সবচেয়ে বড় অজানা বিষয় হলো- চেতনা নিজেই।
মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে চেতনার সম্পর্ক নিয়ে আমরা অনেক কিছু জেনেছি। কিন্তু কীভাবে কয়েক কিলোগ্রাম জৈব পদার্থের নিউরন নেটওয়ার্কের ভেতর থেকে জন্ম নেয় ভালোবাসা, ভয়, স্মৃতি, স্বপ্ন কিংবা নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি, এই রহস্যের পূর্ণ সমাধান এখনো হয়নি।
তাই মৃত্যুর পর চেতনা টিকে থাকে, এ কথা বলার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিদ্যা অন্তত আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সেটা হলো, বাস্তবতা সব সময় আমাদের সাধারণ বুদ্ধির মতো সহজ নয়।
চেতনার ব্যাখ্যা হয়তো একদিন পুরোপুরি নিউরোবায়োলজির মধ্যেই পাওয়া যাবে। সেজন্য হয়তো প্রকৃতির আরও গভীর কোনো স্তরকে বুঝতে হবে।
আর বিজ্ঞানের সৌন্দর্য ঠিক এই জায়গায়। সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়; বরং অজানার সামনে দাঁড়িয়ে সততার সঙ্গে বলতে পারা, “আমরা এখনো জানি না।”
