অনন্ত মহাবিশ্ব: বিগ ব্যাং থেকে মাল্টিভার্সের সন্ধানে
মহাজাগতিক স্ফীতি (Cosmic Inflation)
মাল্টিভার্সের আরেকটি ধারণা এসেছে কসমোলজি থেকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিগ ব্যাংয়ের একেবারে প্রথম দিকে মহাবিশ্ব অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য অকল্পনীয় দ্রুত হারে প্রসারিত হয়েছিল। এই পর্যায়কে বলা হয় ইনফ্লেশন বা মহাজাগতিক স্ফীতি।
ইনফ্লেশনের কিছু মডেলে এই প্রসারণ সব জায়গায় একই সময়ে শেষ হয় না। কোনো অঞ্চলে ইনফ্লেশন থেমে একটি মহাবিশ্বের মতো অঞ্চল তৈরি হতে পারে, অথচ অন্য অঞ্চলে প্রসারণ চলতেই থাকে। ফলে তৈরি হতে পারে আরও নতুন নতুন অঞ্চল। একে বলা হয় ইটারনাল ইনফ্লেশন। এই ধারণা সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্ব হতে পারে অসংখ্য “বাবল ইউনিভার্স” এর মাত্র একটি মহাবিশ্ব। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এটি এখনো তাত্ত্বিক সম্ভাবনা। অন্য কোনো বাবল ইউনিভার্স আমরা সরাসরি দেখিনি।
স্ট্রিংয়ের জগৎ ও ল্যান্ডস্কেপ
আরেকটি সম্ভাবনা এসেছে স্ট্রিং থিওরি থেকে। স্ট্রিং থিওরির কিছু সংস্করণ অনুযায়ী, আমাদের পরিচিত তিনটি স্থানিক মাত্রাই সব নয়। আরও অতিরিক্ত স্থানিক মাত্রা থাকতে পারে, যেগুলো এত ক্ষুদ্রভাবে গুটিয়ে রয়েছে যে আমরা সেগুলো দেখতে পাই না।
এই তত্ত্বে প্রকৃতির মৌলিক ধ্রুবক ও নিয়মের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য বিন্যাস থাকতে পারে। এই সম্ভাব্য বিন্যাসগুলোর সমষ্টিকে প্রায়ই “স্ট্রিং ল্যান্ডস্কেপ” বলা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, বিভিন্ন মহাবিশ্বে এই বিন্যাসগুলো আলাদা হতে পারে। ফলে সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের কার্যকর নিয়মও আমাদের মহাবিশ্বের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এটিও এখনো প্রমাণিত নয়।
উত্তর এখনো অজানা
তাই একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মেনি-ওয়ার্ল্ডস, কসমোলজির ইটারনাল ইনফ্লেশন এবং স্ট্রিং থিওরির ল্যান্ডস্কেপ – তিনটি একই তত্ত্ব নয়। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগিয়েও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারণা আমাদের সামনে একই গভীর প্রশ্ন এনে দাঁড় করায় – আমাদের মহাবিশ্বই কি একমাত্র মহাবিশ্ব? এর উত্তর আমরা এখনো জানি না।
আরশিনগরের পড়শি
হয়তো সত্যিই আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে আরও অসংখ্য মহাবিশ্ব রয়েছে। হয়তো নেই। আর যদি মেনি-ওয়ার্ল্ডসের মতো কোনো ধারণা প্রকৃতির সত্যিকার বর্ণনা হয়ে থাকে, তাহলে আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখন অন্য কোনো মহাবিশ্বে আপনারই মতো আরেকজন হয়তো একই লেখাটি পড়ছেন। আর মুচকি হাসি হাসছেন।
কিন্তু তাঁর সঙ্গে আপনার কোনোদিন দেখা হবে না। সেজন্যই হয়তো মরমি কবি লালন ফকিরের সেই বিখ্যাত গানটি মনে পড়ে যায়- “বাড়ির কাছে আরশিনগর, সেথা এক পড়শি বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।”
ক্ষুদ্র মানুষ ও অসীম মহাবিশ্ব
শুরুতেই বলেছি, মহাবিশ্বের তুলনায় পৃথিবী অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি গ্রহ। কিন্তু এই ক্ষুদ্র গ্রহেই মানুষ নামে এক আশ্চর্য প্রাণী বাস করে। তার মস্তিষ্কের ওজন মাত্র দেড় কেজির কাছাকাছি। অথচ সেই ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়েই মানুষ ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মহাজাগতিক ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করছে। খুঁজে চলেছে স্থান, কাল, পদার্থ এবং মহাবিশ্বের জন্মের রহস্য।
আমাদের মহাবিশ্বই সব, নাকি অসংখ্য মহাবিশ্বের মধ্যে মাত্র একটি, তার উত্তর আজও অজানা। হয়তো কোনো দিন মানুষ সেই উত্তর খুঁজে পাবে। আর হয়তো মহাবিশ্ব কিছু রহস্য চিরকাল তার নিজের কাছেই রেখে দেবে।
