মূল কন্টেন্টে যান
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › প্রকৃতি ও পরিবেশ › সুপার এল নিনো আসছে

সুপার এল নিনো আসছে

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

সর্বশেষ হালনাগাদ: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

👁 ২৭ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
সুপার এল নিনো আসছে

প্রশান্ত মহাসাগরে বড় একটা পরিবর্তন ঘটছে। বিষুবরেখা বরাবর মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে, ‘সুপার এল নিনো’।

তবে ‘সুপার এল নিনো’ কোনো আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক নাম নয়। খুব শক্তিশালী এল নিনো বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

এল নিনো আসলে কী?

স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলে বাণিজ্যবায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। এই বাতাস সমুদ্রের ওপরের উষ্ণ পানিকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।

এল নিনোর সময় এই বাণিজ্যবায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পশ্চিমে জমে থাকা উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের হাজার হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

কয়েক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুনতে খুব বেশি মনে হয় না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগরের বিশাল জলরাশির একটি অংশের কথা বলা হচ্ছে।

আর সেখানেই রয়েছে আসল ব্যাপার। এই বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি তার ওপরের বায়ুমণ্ডলকেও বদলে দেয়। পাল্টে যায় বায়ুচাপ, বাতাসের প্রবাহ এবং মেঘ-বৃষ্টির অবস্থান। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বহু দূরের অঞ্চলেও।

এবারের পরিবর্তনটা কতটা বড়?

২০২৬ সালের আগস্টে মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। আরও পূর্বে, পেরু ও ইকুয়েডরের কাছাকাছি অঞ্চলে এই পার্থক্য পৌঁছেছিল প্রায় ৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কয়েক ডিগ্রি শুনতে সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের এত বিশাল এলাকাজুড়ে এই অতিরিক্ত তাপ জমা হওয়া বায়ুমণ্ডলের প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দেওয়ার মতো বিশাল ঘটনা।

এশিয়ায় কী হতে পারে?

এল নিনোর সময় ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে খরা, পানির সংকট এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

দক্ষিণ এশিয়াতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টির একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ও এর আশপাশের অঞ্চলে বর্ষা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ বা ভারতে এল নিনো হলেই খরা হবে এমন নয়। ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোলসহ আরও অনেক বিষয় আমাদের দেশের বর্ষাকে প্রভাবিত করে।

অস্ট্রেলিয়ায় কী হতে পারে?

অস্ট্রেলিয়ায় এল নিনোর প্রভাব সাধারণত বেশ স্পষ্ট। বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। দিন তুলনামূলক গরম হতে পারে। মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে কৃষিতে চাপ পড়ে এবং গ্রীষ্মের দিকে বুশফায়ারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

আমেরিকায় পরিস্থিতি ভিন্ন

আমেরিকায় আবার অন্য ছবি।

পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি পেরু ও ইকুয়েডরের উপকূলের দিকে চলে আসায় সেখানে বৃষ্টিপাত অনেক বেড়ে যেতে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর সময় অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধস বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

উত্তর আমেরিকাতেও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছক বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে শীতকালে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টি ও ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অন্যদিকে উত্তরের কিছু অঞ্চল তুলনামূলক উষ্ণ থাকতে পারে।

আরও মজার ব্যাপার হলো, এল নিনোর সময় আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর বায়ুর বিভিন্ন স্তরের গতির পার্থক্য বা উইন্ড শিয়ার বেড়ে যেতে পারে। এতে আটলান্টিকে হারিকেন তৈরির পরিবেশ অনেক সময় প্রতিকূল হয়ে পড়ে।

একই এল নিনো, দুই বিপরীত ফল

এটাই এল নিনোর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক। একই মহাসাগরীয় পরিবর্তনের ফলে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো অঞ্চল খরায় ভুগতে পারে, আবার হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আমেরিকার কোনো অঞ্চল অতিবৃষ্টি ও বন্যার মুখে পড়তে পারে। খুব সহজ করে বললে, এল নিনো পৃথিবীর বৃষ্টি ও বাতাসের পরিচিত মানচিত্রটাকেই লন্ডভন্ড করে দেয়।

এল নিনো অবশ্য নতুন কিছু নয়। হাজার হাজার বছর ধরেই পৃথিবীর এই প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্র চলছে। কিন্তু এবার পার্থক্যটা হলো, এল নিনো এমন এক পৃথিবীতে ঘটছে, যেটি আগে থেকেই অনেকটা উষ্ণ। সমুদ্রেও জমে রয়েছে বিপুল অতিরিক্ত তাপ।

ফলে শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে এই বাড়তি উষ্ণতা যোগ হলে কোথাও খরা ও দাবদাহ আরও তীব্র হতে পারে, কোথাও বাড়তে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি।

প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল একটি অংশের পানি মাত্র কয়েক ডিগ্রি বেশি উষ্ণ হয়েছে। এই সামান্য পরিবর্তনই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের আকাশে মেঘের গতিপথ বদলে দিতে পারে। এক দেশে বৃষ্টি কেড়ে নিতে পারে, অন্য দেশে নামিয়ে আনতে পারে প্রবল বর্ষণ। কোথাও শুকিয়ে দিতে পারে ফসলের মাঠ, কোথাও ডুবিয়ে দিতে পারে গোটা জনপদ।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগর যখন একটু বেশি গরম হয়ে ওঠে, তার প্রভাব শুধু সমুদ্রে আটকে থাকে না। বদলে যেতে পারে পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ার ছক। এটাই এল নিনোর অসাধারণ ক্ষমতা।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।