সাম্প্রতিক একটি আবিষ্কার জীববিজ্ঞানের এক পুরোনো ও শক্তিশালী ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই ধারণার নাম, “সেন্ট্রাল ডগমা”। নামটা একটু জটিল শোনালেও এর মূল কথা খুব সহজ।
১৯৫৮ সালে ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক এই ধারণাটি দেন। তার মতে, জিনগত তথ্য একমুখীভাবে প্রবাহিত হয়:
ডিএনএ → আরএনএ → প্রোটিন
অর্থাৎ, ডিএনএ-তে সংরক্ষিত তথ্য আগে আরএনএ-তে অনুলিখিত হয়, তারপর সেই আরএনএ থেকে তৈরি হয় প্রোটিন।
তবে পরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, কিছু কিছু ভাইরাস এই পথ উল্টো দিকেও চালাতে পারে। ১৯৭০ সালে বিজ্ঞানীরা রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ নামের এক বিশেষ এনজাইম খুঁজে পান, যেটা আরএনএ থেকে আবার ডিএনএ তৈরি করতে পারে।
এতে অনেকে ভেবেছিলেন, বুঝি সেন্ট্রাল ডগমা ভেঙে গেল। কিন্তু আসলে তা হয়নি। কারণ ক্রিকের মূল বক্তব্য ছিল, তথ্য একবার প্রোটিনে চলে গেলে সেটা আর ফিরে নিউক্লিক অ্যাসিডে আসে না। এটাই সেন্ট্রাল ডগমার আসল শক্তি।
তবে এই ধারণার ভেতরে আরেকটি গভীর নিয়মও ছিল: নতুন ডিএনএ তৈরি করতে হলে পুরোনো ডিএনএ টেমপ্লেট দরকার।
অর্থাৎ প্রকৃতি মূলত কপি করে কাজ করে। এই কপি তৈরির কাজ করে ডিএনএ পলিমারেজ নামের একটি এনজাইম, যেটা পুরোনো ডিএনএ স্ট্র্যান্ডকে টেমপ্লেট হিসেবে ব্যবহার করে তার বিপরীত অনুক্রমে নতুন ডিএনএ তৈরি করে। এতদিন মনে করা হতো, টেমপ্লেট ছাড়া এই কাজ অসম্ভব।
ডি নোভো ডিএনএ সিন্থেসিস: টেমপ্লেট ছাড়াই নতুন ডিএনএ
এখানেই এসেছে বড় বিস্ময়। সম্প্রতি, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে, বিজ্ঞানীরা দুটি নতুন এনজাইমের সন্ধান দিয়েছেন। এদের নাম, DRT3 এবং DRT7। এরা কোনো টেমপ্লেট ছাড়াই নতুন ডিএনএ তৈরি করতে পারে।
এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে – ডি নোভো ডিএনএ সিন্থেসিস, অর্থাৎ একেবারে শূন্য থেকে জিনগত লেখা তৈরি করা।
এটা কেন এত বড় ঘটনা? কারণ এখানে ডিএনএ শুধু কপি হচ্ছে না; এখানে নতুন তথ্য তৈরি হচ্ছে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এটা এক ধরনের, “জেনেটিক সৃজনশীলতা”।
DRT3 প্রথম আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, এটা হয়তো বিবর্তনের কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই DRT7 র আবিষ্কার সেই ধারণা বদলে দেয়।
DRT3 এবং DRT7: প্রকৃতির অভিনব সমাধান
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুই এনজাইম একই কাজ করলেও তাদের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা।
DRT3 কাজ করে একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক পকেটের মাধ্যমে, যেখানে নির্দিষ্ট নিউক্লিওটাইড একে একে বসানো হয়। অন্যদিকে, DRT7 এর ভেতরে রয়েছে একটি খোলা ক্যাটালিটিক ফাঁক, যেটা অনেক বেশি নমনীয়ভাবে নিউক্লিওটাইড জুড়ে দেয়। অর্থাৎ, প্রকৃতি একই সমস্যার দুইটি সম্পূর্ণ আলাদা সমাধান বের করেছে।
এটা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় ইঙ্গিত।টেমপ্লেট ছাড়া ডিএনএ তৈরির ক্ষমতা হয়তো জীবনের ইতিহাসে একাধিকবার স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হয়েছে। এর অর্থ আরও গভীর।
জীবনের উৎপত্তি এবং বায়োটেকনোলজির ভবিষ্যৎ
পৃথিবীতে জীবনের শুরুতে তো কোনো “পুরোনো ডিএনএ” ছিল না। তাহলে প্রথম জিনগত তথ্য এলো কোথা থেকে?
এই আবিষ্কার সেই প্রাচীন প্রশ্নে নতুন আলো ফেলছে। হয়তো জীবনের একেবারে শুরুর দিকে এমনই কিছু এনজাইম প্রথম জিনগত বাক্য লিখেছিল।
বায়োটেকনোলজির দিক থেকেও এর সম্ভাবনা বিশাল। আজ কৃত্রিম ডিএনএ তৈরি করতে রাসায়নিক সংশ্লেষণ লাগে, যেটা ব্যয়বহুল, জটিল এবং পরিবেশের জন্যও খুব সুবিধাজনক নয়। কিন্তু DRT3 এবং DRT7 এর পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো সম্পূর্ণ এনজাইম-নির্ভর “ডিএনএ প্রিন্টিং” সম্ভব হবে।
এই নতুন আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দিল- জীবন শুধু পুরোনো তথ্যের উত্তরাধিকার বহন করে না; কখনো কখনো জীবন নিজেই নতুন জিনগত ভাষা লিখতে পারে। আর সেটাই হয়তো বিবর্তনের সবচেয়ে গভীর গোপন রহস্য।
তথ্যসূত্র:
-
Science (2026). Protein-templated synthesis of dinucleotide repeat DNA by an antiphage reverse transcriptase. Science, published online April 16, 2026. https://www.science.org/doi/10.1126/science.aed1656
-
bioRxiv (2026). Antiviral reverse transcriptase–primase synthesizes protein-templated DNA. Preprint published April 19, 2026.
https://www.biorxiv.org/content/10.64898/2026.04.18.719102v1
