আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি হলো, ডার্ক ম্যাটার। একটু কঠিন ভাষায় বললে, এটি বিজ্ঞানীদের জন্য এক ধরনের অস্বস্তিকর সমস্যা। কারণ তাঁরা জানেন এটি আছে, কিন্তু কী জিনিস, সেটা তাঁরা জানেন না। এজন্যই মনে হয়, এর নামের শুরুতে “ডার্ক” তকমাটা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেন বোঝা যায় এটি আছে?
কারণ ডার্ক ম্যাটার না থাকলে গ্যালাক্সিগুলো অনেক আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। দৃশ্যমান নক্ষত্র, গ্যাস আর মহাজাগতিক ধুলোর ভর দিয়ে হিসেব করলে গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত মহাকর্ষ পাওয়া যায় না। অথচ বিজ্ঞানীদের হিসেব বলছে, দৃশ্যমান পদার্থের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি অদৃশ্য ভর কোথাও লুকিয়ে আছে। মহাবিশ্বের মোট পদার্থ-শক্তির প্রায় ২৭ শতাংশই এই রহস্যময় উপাদান।
এর নাম ডার্ক ম্যাটার। একে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু এর মহাকর্ষ কাজ করে দৃশ্যমান সকল পদার্থের উপর।
কিন্তু সেটি আসলে কী?
এ ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক মিচিও কাকু একটি চমকপ্রদ ধারণা দিয়েছেন। তাঁর ভাবনার শেকড় রয়েছে, স্ট্রিং থিওরিতে। স্ট্রিং থিওরি অনুযায়ী, আমাদের মহাবিশ্ব এক ধরনের মেমব্রেন বা ঝিল্লির মতো, যেটা উচ্চমাত্রিক এক বিশাল বাস্তবতায় ভাসছে।
আর এখানেই আসে মহাকর্ষের বিষয়টি। আমরা জানি, প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে মহাকর্ষ সবচেয়ে দুর্বল বল। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন মহাকর্ষ এত দুর্বল? এর একটি ব্যাখ্যা হলো, মহাকর্ষ হয়তো অতিরিক্ত মাত্রায় “লিক” করে যাচ্ছে। অর্থাৎ মহাকর্ষের কিছু অংশ আমাদের পরিচিত তিন মাত্রার মহাবিশ্বের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মহাকর্ষীয় টান আমাদের মহাবিশ্বের সীমানার বাইরে যেতে পারে। একইভাবে অন্য মহাবিশ্বের মহাকর্ষও আমাদের চেনা মহাবিশ্বে প্রভাব ফেলতে পারে।
মিচিও কাকুর ব্যাখ্যা
যদি তা-ই হয়, তাহলে আমরা যাকে ডার্ক ম্যাটার বলে ভাবছি, সেটি হয়তো আসলে আমাদের মহাবিশ্বের পাশের আরেকটি সমান্তরাল মহাবিশ্বের পদার্থের মহাকর্ষীয় টান। সেই পদার্থ আমরা দেখতে পাই না, কারণ সেটা রয়েছে আমাদের দৃশ্যমান মাত্রার বাইরে। কিন্তু তার মহাকর্ষ আমাদের জগতে এসে প্রভাব ফেলছে।
মিচিও কাকুর ব্যাখ্যাটা শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি মনে হতে পারে। অবশ্য মিচিও কাকুর চিন্তাধারা সবসময়ই অন্যরকম। কিন্তু এটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ অতিরিক্ত মাত্রা নিয়ে বহু মূলধারার পদার্থবিদ কয়েক দশক ধরে কাজ করছেন। স্ট্রিং থিওরির সংশোধিত ভার্সন এম থিওরিতে এগারো মাত্রার কথা বলা হয়েছে।
অন্য মহাবিশ্বের ছায়া
কিন্তু সমস্যা হলো, এখনও পর্যন্ত এর কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ মেলেনি। কোন পার্টিক্যাল এক্সেলেটারে সেই প্রত্যাশিত সংকেত ধরা পড়েনি। অন্যদিকে, ডার্ক ম্যাটার কণার খোঁজও চলেছে চার দশকের বেশি সময় ধরে। এখনও কিছুই পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি ভুল জিনিস খুঁজছি?
হয়তো এর উত্তর লুকিয়ে আছে অতিরিক্ত মাত্রায়। হয়তো মহাকর্ষের নিয়মই পুরোপুরি বোঝা হয়নি। কিংবা পারিপার্শ্বিকের আড়ালে হয়তো এমন কিছু আছে, যেটা আমরা এখনো কল্পনাও করিনি।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত। যে রহস্যই হোক, সেটাই নিয়ন্ত্রণ করছে মহাকাশের প্রতিটি গ্যালাক্সির গঠন। অর্থাৎ রাতের আকাশে আমরা যে মহাবিশ্বকে দেখি, তার বড় অংশই এখনো আমাদের অজানা। হয়তো একদিন আমরা জানতে পারব, ডার্ক ম্যাটার আসলে কোনো অদৃশ্য কণা নয়, বরং অন্য এক মহাবিশ্বের ছায়া। আর যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে আমাদের চারপাশের বাস্তবতা সম্পর্কে যা কিছু আমরা জানি, তার সবকিছুই আবার নতুন করে লিখতে হবে।
