মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাবিজ্ঞানীদের কথাকার্ল সেগান: মহাবিশ্বের গল্পকার

কার্ল সেগান: মহাবিশ্বের গল্পকার

২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১৯৯ 💬 ০
কার্ল সেগান: মহাবিশ্বের গল্পকার

কার্ল সেগান (১৯৩৪–১৯৯৬) আধুনিক যুগের সেই বিরল বিজ্ঞানীদের একজন, যিনি গবেষণাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। আজ ২০ ডিসেম্বর এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৬ সালের এই দিনে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তিনি বিদায় নেন। (তাঁর জন্মদিন ছিল ৯ নভেম্বর, ১৯৩৪।)

তিনি ছিলেন একাধারে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গ্রহবিজ্ঞানী এবং অসামান্য বিজ্ঞান বক্তা। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেন এবং পরে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন।

গ্রহবিজ্ঞান ও গবেষণা

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়েই কার্ল সেগান গ্রহবিজ্ঞান গবেষণার একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলেন। তাঁর গবেষণার পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে:

  • শুক্র গ্রহের ঘন মেঘ ও তীব্র গ্রিনহাউস প্রভাব নিয়ে গবেষণা।
  • মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের প্রকৃতি বিশ্লেষণ।
  • বৃহস্পতির উপগ্রহগুলোর রসায়ন।
  • পৃথিবীর প্রাচীন জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস অনুসন্ধান।

নাসা ও ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড

নাসার বহু গ্রহ অনুসন্ধান অভিযানে কার্ল সেগানের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। পাইওনিয়ার ও ভয়েজার অভিযানে মানুষের পক্ষ থেকে যেসব অভিনন্দন বার্তা মহাশূন্যে পাঠানো হয়েছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। এই বার্তাগুলোতে ছিল:

  • পৃথিবীর নানা ছবি ও শব্দ
  • বিভিন্ন সংস্কৃতির সংগীত
  • বহু ভাষায় শুভেচ্ছাবার্তা

বিশেষ করে ভয়েজারের গোল্ডেন রেকর্ড আজও মানবসভ্যতার এক অনন্য সাংস্কৃতিক দলিল হয়ে মহাকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভবিষ্যতের কোনো ভিনগ্রহী সভ্যতা যদি একদিন সেটি খুঁজে পায়, তবে পৃথিবীর মানুষের পরিচয় তারা পাবে কার্ল সেগানের কল্পনা ও মানবতাবোধের হাত ধরেই।

কসমস ও বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ

তবে মৌলিক গবেষণার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের কাজ। ১৯৮০ সালে প্রচারিত টেলিভিশন ধারাবাহিক সিরিজ “কসমস: এ পার্সোনাল ভয়েজ” (Cosmos: A Personal Voyage) ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।

কোটি কোটি মানুষের মনে মহাবিশ্বের প্রতি কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছিল এই সিরিজ। তিনি দেখিয়েছিলেন, মহাবিশ্ব কোনো দূরের, ভীতিকর ধারণা নয়; বরং আমরা সবাই এরই অংশ।

লেখালেখি ও দর্শন

লেখালেখিতেও কার্ল সেগান ছিলেন সমান দক্ষ। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের নানা শাখা নিয়ে তাঁর ছয় শতাধিক গবেষণাপত্র রয়েছে। এছাড়াও তিনি লিখেছেন বিশটিরও বেশি বই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:

  • দ্য ড্রাগনস অব ইডেন (The Dragons of Eden)
  • কন্টাক্ট (Contact)
  • কসমস (Cosmos)
  • পেল ব্লু ডট (Pale Blue Dot)

এইসব বইগুলোতে বিজ্ঞান, দর্শন ও মানবিক প্রশ্ন একসাথে মিশে গেছে। বিশেষ করে পেল ব্লু ডট বইতে ভয়েজার থেকে তোলা পৃথিবীর সেই ক্ষুদ্র ছবিকে কেন্দ্র করে তিনি আমাদের অহংকার ভাঙার শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে আমরা কতটা ক্ষুদ্র, অথচ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব কতটা বড়।

মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতা ও বিশ্বাস

ভিনগ্রহে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে সেগানের আগ্রহ ছিল গভীর, কিন্তু সবসময় তা ছিল যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রমাণনির্ভর। তিনি প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতেন, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাসকে কখনো সমর্থন করেননি। তাঁর সেই বহুল উদ্ধৃত উক্তিটি আজও প্রাসঙ্গিক:

“এত বিশাল মহাবিশ্ব যদি শুধু আমাদের জন্যই হয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে জায়গার ভীষণ অপচয় হয়েছে।”

এটা ছিল মানুষের আত্মকেন্দ্রিক অহংকারের বিরুদ্ধে এক শান্ত অথচ সংযত প্রতিবাদ।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র বাষট্টি বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, তাঁর লেখা, তাঁর ভাবনা আজও জীবিত। বিজ্ঞানকে ভয়ের নয়, ভালোবাসার চোখে দেখার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে কার্ল সেগান-এর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, আমরা সবাই নক্ষত্রের ধূলিকণা দিয়ে গড়া এই মহাবিশ্বেরই সন্তান।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *