বেস এডিটিং
বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ঠিক তেমনই একটি ঘোষণা দিয়েছেন।
গবেষকেরা প্রথমবারের মতো মানব ভ্রূণের ডিএনএ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সম্পাদনা করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা ব্যবহার করেছেন “বেস এডিটিং” (Base Editing) নামের একটি উন্নত জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিএনএর একটি নির্দিষ্ট অক্ষর পরিবর্তন করা যায়, অথচ ডিএনএকে কেটে ফেলার প্রয়োজন হয় না।
ডিএনএতে বানান ভুল
আমাদের ডিএনএকে যদি একটি বিশাল বই ধরা হয়, তাহলে অনেক বংশগত রোগের কারণ হলো সেই বইয়ের কোথাও একটি মাত্র বানান ভুল। সিকল সেল অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া কিংবা আরও অনেক জিনগত রোগের পেছনে এমন কিছু ক্ষুদ্র ভুল লুকিয়ে থাকতে পারে।
বেস এডিটিং প্রযুক্তি সেই ভুল অক্ষরটিকেই খুঁজে বের করে সংশোধন করার চেষ্টা করে। যেন হাজার হাজার পৃষ্ঠার একটি বইয়ে একটি মাত্র ভুল বানান খুঁজে সেটি ঠিক করে দেওয়া।
প্রচলিত CRISPR প্রযুক্তি সাধারণত ডিএনএ কেটে পরিবর্তন আনে। কিন্তু বেস এডিটিং অনেকটা পেন্সিল দিয়ে একটি ভুল অক্ষর মুছে তার জায়গায় সঠিক অক্ষর বসিয়ে দেওয়ার মতো। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
গবেষণায় কী করা হয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ডিটার এগলি এবং তাঁর সহকর্মীরা পরীক্ষাগারে তৈরি মানব ভ্রূণে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করেন। তারা PCSK9, HBG1 এবং HBG2 নামের কয়েকটি জিনে নির্দিষ্ট পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।
এর মধ্যে HBG1 এবং HBG2 জিনে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটা প্রকৃতিতে বিদ্যমান একটি উপকারী জিনগত বৈচিত্র্যের অনুকরণ। এই বৈচিত্র্য সিকল সেল অ্যানিমিয়া ও থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভ্রূণগুলো গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো কোনো নারীর গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয়নি এবং এগুলো থেকে কোনো শিশুর জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল না।
একটি মাইলফলক?
মানব ভ্রূণে জিন সম্পাদনার চেষ্টা আগে হয়েছে। কিন্তু আগের প্রযুক্তিগুলোতে ডিএনএ কেটে পরিবর্তন আনা হতো, ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত মিউটেশন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি ছিল। নতুন গবেষণাটি দেখিয়েছে যে ডিএনএ না কেটেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা সম্ভব। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, এটি মানব জার্মলাইন জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি।
বড় বাধা মোজাইকিজম
তবে সব খবরই সুখবর নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রূণের সব কোষে একই রকম পরিবর্তন ঘটেনি। কিছু কোষে কাঙ্ক্ষিত সম্পাদনা হয়েছে, আবার কিছু কোষ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যাকে বলেন “মোজাইকিজম”।
এটি বড় একটি সমস্যা। কারণ ভবিষ্যতে যদি কোনো ভ্রূণ থেকে শিশু জন্ম নেয়, তাহলে তার শরীরের কিছু কোষে পরিবর্তিত জিন থাকতে পারে, আবার কিছু কোষে নাও থাকতে পারে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নাও পাওয়া যেতে পারে।
বিতর্কের সূচনা
এখানেই শুরু হয়েছে নৈতিক বিতর্ক। কারণ একটি ভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তন মানে শুধু একজন মানুষের জিন পরিবর্তন নয়। সেই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ আজ করা একটি জিনগত পরিবর্তনের প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে টিকে থাকতে পারে।
এ কারণেই অনেক বিজ্ঞানী ও নীতি নির্ধারক উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এই প্রযুক্তি একসময় “ডিজাইনার বেবি” তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কেউ হয়তো বেশি বুদ্ধিমান, বেশি লম্বা কিংবা নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সন্তান তৈরির চেষ্টা করবে।
অতীতের একটি বিতর্কিত অধ্যায়
মানব ভ্রূণের জিন সম্পাদনা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৮ সালে চীনা বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই ঘোষণা দেন, তিনি CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানব ভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তন করেছেন এবং সেই ভ্রূণ থেকে যমজ শিশুর জন্ম হয়েছে। তিনি CCR5 নামের একটি জিন পরিবর্তন করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের এইচআইভি সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তোলা। কিন্তু এই কাজটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক নীতিমালা উপেক্ষা করে করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। চীনা কর্তৃপক্ষ তাঁর গবেষণাকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং পরে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সেই ঘটনার পর থেকেই মানব ভ্রূণের জিন সম্পাদনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন। বর্তমান গবেষণাটিও তাই কোনো শিশুর জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। বরং এটি একটি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে বংশগত রোগ প্রতিরোধের সম্ভাবনা যাচাই করা। অনেকের মতে, হে জিয়ানকুই এর ঘটনা ছিল একটি সতর্কবার্তা। আর বর্তমান গবেষণা দেখাচ্ছে, একই প্রযুক্তি কীভাবে আরও নিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথে এগোতে পারে।
এখনও অনেক পথ বাকি
বর্তমান গবেষণাটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যেমন উত্তেজনা রয়েছে, তেমনি সতর্কতাও রয়েছে। কারণ এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা। নিরাপত্তা, নির্ভুলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণাটি এখনো পিয়ার-রিভিউ সম্পন্ন করেনি। অর্থাৎ অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনও বাকি রয়েছে।
জীবনের নকশায় মানুষের হাত
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট। বিজ্ঞান এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে আমরা আর শুধু রোগের চিকিৎসা করছি না। আমরা জীবনের মূল নকশা, ডিএনএ নিজ হাতে নিখুঁতভাবে সম্পাদনা করার ক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করেছি।
প্রশ্ন হলো, এই অসাধারণ ক্ষমতা আমরা কতটা দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারব?
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কোনো প্রযুক্তিই নিজে ভালো বা মন্দ নয়। সবকিছু নির্ভর করে সেটি মানুষের হাতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।
ছবি: চার-কোষবিশিষ্ট একটি মানব ভ্রূণ। ছবির স্বত্ব: হুয়ান গার্টনার / সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি।
