মূল কন্টেন্টে যান
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাকোয়ান্টাম বিজ্ঞাননতুন চোখে দেখা ফোটন

নতুন চোখে দেখা ফোটন

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১৬০ 💬 ০
নতুন চোখে দেখা ফোটন

আলোর কণা ও চিরন্তন প্রশ্ন

প্রতিদিন আমরা আলো দেখি। জানালার পর্দা সরালে ঘরে ঢুকে পড়ে, বাতি জ্বালালে ঘর ভরে যায়, সূর্য উঠলেই চারপাশ আলোকিত হয়। কিন্তু এই আলো আসলে কী? এই প্রশ্নটা মানুষ কয়েকশ বছর ধরেই করে আসছে।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলছে, আলো কোনো একটানা তরঙ্গ নয়, আলো তৈরি হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে—যাদের নাম ফোটন

অদেখা কণার দৃশ্যমান রূপ

এতদিন পর্যন্ত ফোটনকে আমরা জানতাম শুধু সমীকরণে, গ্রাফে আর ডায়াগ্রামে। কিন্তু কেউ কখনো ফোটনকে “দেখেনি”। কারণ ফোটন অসম্ভব ছোট, আর ফোটন এমনভাবে আচরণ করে যে সাধারণ ক্যামেরায় তার আসল রূপ ধরা পড়ে না।

কিন্তু এবার ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের গবেষকরা একটি বড় কাজ করেছেন। তারা প্রথমবারের মতো একক ফোটনের চিত্র তৈরি করতে পেরেছেন। এটি সরাসরি ছবি না হলেও, এই চিত্র দেখে ফোটনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্ষেত্রের বণ্টন বোঝা যায়। অর্থাৎ এটা এমন একটি ভিজ্যুয়াল মানচিত্র, যেটা দেখলে বোঝা যায়, একটি ফোটন বাস্তবে কেমনভাবে ছড়িয়ে থাকে।

ফোটন দেখতে লেবুর মতো!

এবং এখানেই এসেছে সবচেয়ে মজার চমক। ফোটন দেখতে গোল নয়। চৌকোও নয়। বরং অনেকটা লেবুর মতো। হ্যাঁ, ঠিক যেন লেবু। দু’দিক একটু লম্বা, মাঝখানে ফোলা টানটান—অবিকল লেবুর আকৃতি।

এখন প্রশ্ন হলো, ফোটনের আকৃতি এমন কেন?

আকৃতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

আসলে ফোটন কোনো শক্ত বলের মতো কণা নয়। কোয়ান্টাম জগতে ফোটন এক ধরনের সম্ভাবনার মেঘের মত ছড়িয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা যখন ফোটন কোথায় থাকতে পারে, কোন দিকে শক্তি বেশি ছড়ায়—এই সব তথ্য জড়ো করে মানচিত্রটি বানালেন, তখন দেখা গেল ফোটনের শক্তি সবদিকে সমানভাবে ছড়ায় না।

কিছু দিক আছে, যেদিকে আলো একটু বেশি জোরে “ছুটতে চায়”। ফোটনের সেই অসম শক্তি বণ্টনের কারণেই তৈরি হয়েছে এই লেবু-আকৃতি। তার মানে ফোটন একটি ছোট্ট আলোর বিন্দু নয়। ফোটন মানে একটি ছড়ানো সম্ভাবনার মেঘ, যার নিজেরও একটি গঠন রয়েছে।

ভুল ধারণা ও কোয়ান্টাম বাস্তবতা

নতুন এই আবিষ্কার পুরোনো ভুল ধারণা ভাঙছে। আমরা মনে করি—কণা মানে বুঝি শক্ত, ছোট্ট একটা জিনিস। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে কণা অনেকটা সম্ভাবনার তরঙ্গের মতো। তার “আকার” নির্ভর করে:

  • সে কীভাবে তৈরি হচ্ছে।
  • কোথা থেকে বের হচ্ছে।
  • এবং আমরা তাকে কীভাবে মাপছি তার ওপর।

মেঘের যেমন কোনো ধারালো কিনারা নেই, কিন্তু মেঘেরও একটা আকৃতি থাকে। ফোটনও ঠিক তেমনি, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না কিন্তু তার আকৃতি আছে।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে গুরুত্ব

এই কাজটা শুধু নিছক বিজ্ঞানের কৌতূহলের জন্য নয়। ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব অপরিসীম:

  • কোয়ান্টাম কম্পিউটার: আরো শক্তিশালী প্রসেসিংয়ের জন্য।
  • কোয়ান্টাম ইন্টারনেট: নিরাপদ যোগাযোগের জন্য।
  • সংবেদনশীল সেন্সর: আলোর সাহায্যে অতি সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য।

ফোটন আসলে কীভাবে আচরণ করে, সেটা খুব ভালোভাবে জানা দরকার। সেই বোঝাপড়ায় এই “লেবু-আকৃতির ফোটন” একটা বড় পদক্ষেপ।

উপসংহার

এক সময় মানুষ মনে করতো, আলো শুধু শক্তি। তারপর জানা গেল, আলো আসলে তরঙ্গ। তারপর আরো জানা গেল, আলো এক ধরনের কণাও। এবার জানা গেল, আলোর কণার নিজস্ব আকৃতিও রয়েছে। বিজ্ঞান ঠিক এভাবেই এগোয়। পরিচিত জিনিসকে নতুন চোখে দেখে। আর সেই নতুন চোখে তাকিয়ে আজ আমরা বুঝতে পারছি, আলোকে যতটা সহজ-সরল মনে হয়, আসলে ততটাই রহস্যময়।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।