মূল কন্টেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › কোয়ান্টাম বিজ্ঞান › অদৃশ্য বাস্তবতা ও কোয়ান্টাম রহস্য

অদৃশ্য বাস্তবতা ও কোয়ান্টাম রহস্য

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

সর্বশেষ হালনাগাদ: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

👁 ১৩৪ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
অদৃশ্য বাস্তবতা ও কোয়ান্টাম রহস্য

কঠিন পদার্থের আড়ালে শূন্যতা

ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান বইয়ে পরমাণুর খুব পরিচিত একটি ছবি দেখে আমরা বড় হয়েছি। পরমাণু মানে মাঝখানে শক্ত গোল নিউক্লিয়াস, আর তার চারপাশে বন বন করে ঘুরছে কিছু ইলেকট্রন। দেখে মনে হয়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো একসাথে জোড়া লেগে আছে, আর সেগুলো মিলেই তৈরি হয়েছে এই নিরেট পৃথিবী।

আমাদের চারপাশের সবকিছুই—চেয়ার, টেবিল, দেয়াল—খুবই “সলিড” বা কঠিন মনে হয়। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আমাদের সামনে একেবারে উল্টো ছবি তুলে ধরেছে। বাস্তবতা হলো, পরমাণুর ভেতরটা আসলে প্রায় পুরোপুরিই ফাঁকা। আর যেটুকু বস্তু আছে, সেটা কোনো শক্ত বস্তু নয়, বরং এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির ঝড়!

স্টেডিয়াম ও মার্বেলের উপমা

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। পরমাণুর নিউক্লিয়াস যদি একটি বিশাল ফুটবল স্টেডিয়ামের মাঝখানে রাখা একটি ছোট্ট মার্বেলের সমান হয়, তাহলে ইলেকট্রনগুলো থাকবে সেই স্টেডিয়ামের একদম বাইরের গ্যালারির প্রান্তে! মাঝখানের মাঠের বিশাল অংশটা থাকবে একেবারেই ফাঁকা।

বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, পরমাণুর ভেতরের অংশটি শতকরা ৯৯.৯৯৯৯ ভাগের চেয়েও বেশি ফাঁকা। অর্থাৎ, আমাদের শরীর, পৃথিবী, পাহাড়, সমুদ্র সবকিছুই তৈরি হয়েছে মূলত “ফাঁকা জায়গা” দিয়ে। ভাবা যায়?

কণা নয়, সম্ভাবনার মেঘ

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বলছে, ইলেকট্রনগুলো আসলে ছোট বলের মতো কণা নয়, বরং সম্ভাবনার মেঘের মতো আচরণ করে। তারা সব সময় ছোটাছুটি করছে, তরঙ্গের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে আছে এবং নিউক্লিয়াসের চারপাশে এক ধরনের শক্তির ফিল্ড তৈরি করছে।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, আমরা যাকে “কণা” বলি, সেগুলোও আসলে পুরোপুরি কণা নয়। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি বলছে, মহাবিশ্বের মৌলিক বাস্তবতা হলো ফিল্ড বা ক্ষেত্র।

  • ইলেকট্রন ফিল্ড আছে।
  • ফোটন ফিল্ড আছে।
  • কোয়ার্ক ফিল্ড আছে।

কণাগুলো আসলে এই ফিল্ডের ছোট ছোট কম্পন বা এক্সাইটেশন। অনেকটা শান্ত পানির উপর ঢেউ ওঠার মতো। ঢেউটাকে আলাদা কিছু মনে হলেও আসলে সেটা পানিরই অংশ। ঠিক তেমনি ইলেকট্রন বা ফোটন হলো কোয়ান্টাম ফিল্ডের ভেতরে জেগে ওঠা শক্তির ঢেউ।

ডাইনামিক জগত ও শক্তির ঢেউ

এখন “শক্তির ঢেউ” কথাটা কেন ব্যবহার করা হয়? কারণ পরমাণুর ভেতরে সবকিছুই অবিশ্বাস্য রকম ডাইনামিক বা গতিশীল। ইলেকট্রন স্থির নয়, অন্যদিকে নিউক্লিয়াসের ভেতরে প্রোটন ও নিউট্রনও কোয়ার্ক আর গ্লুয়নের মাধ্যমে ক্রমাগত শক্তি বিনিময় করছে।

সবকিছু কাঁপছে, নড়ছে, বদলাচ্ছে। আমরা বাইরে থেকে যেটাকে স্থির আর শক্ত দেখি, ভেতরে ভেতরে সেটা আসলে এক বিশাল অদৃশ্য শক্তির ঝড় আর সম্ভাবনার ঢেউ।

ফাঁকা হলে দেয়ালে ধাক্কা খাই কেন?

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, দেয়ালে ধাক্কা খেলে আমরা ব্যথা পাই কেন? যদি সবকিছু ফাঁকা হয়, তাহলে আমরা দেয়ালের ভেতরে ঢুকে যাই না কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইলেকট্রনের বৈদ্যুতিক চার্জ আর কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে।

১. ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বল: যখন আমরা হাত দিয়ে দেয়াল ঠেলি, তখন আমাদের হাতের ইলেকট্রন আর দেয়ালের ইলেকট্রনের মধ্যে শক্তিশালী বিকর্ষণ বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বল তৈরি হয়। এই বলই আমাদের থামিয়ে দেয়। ২. পাউলির বর্জন নীতি: এর সাথে আরও একটি কোয়ান্টাম নিয়ম কাজ করে, যার নাম ‘পাউলির বর্জন নীতি’ (Pauli Exclusion Principle)। এই নিয়ম অনুযায়ী, দুটি ইলেকট্রন একই কোয়ান্টাম অবস্থায় একসাথে থাকতে পারে না।

ফলে আমাদের হাতের ইলেকট্রন আর দেয়ালের ইলেকট্রন একে অপরের জায়গায় ঢুকে যেতে পারে না। তাই আমরা দেয়ালের ভেতরে ঢুকে যাই না, কারণ এই শক্তির ফিল্ড আর কোয়ান্টাম নিয়ম একসাথে আমাদের থামিয়ে দেয়।

ই = এমসি স্কয়ার ও শক্তির গল্প

এই পুরো চিত্রটা বাস্তবতাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। আমরা যাকে “বস্তু” ভাবি, সেটা আসলে বস্তু নয়। সেটা হচ্ছে শক্তি, ফিল্ড আর কোয়ান্টাম নিয়মের এক জটিল সমন্বয়।

আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E = mc² আগেই বলেছিল, ভর আর শক্তি একে অপরের রূপান্তর। আজকের পদার্থবিজ্ঞান যেন সেই ধারণাকেই আরও গভীরে নিয়ে গেছে। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, শেষ পর্যন্ত সবকিছুই শক্তির গল্প।

প্রযুক্তি ও অদৃশ্য জগত

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় আটকে নেই। আধুনিক প্রযুক্তি—সেমিকন্ডাক্টর, লেজার, এমআরআই (MRI) মেশিন থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং—এসব কিছুর পেছনেই এই অদৃশ্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা কাজ করছে। তার মানে, আমরা প্রতিদিন এমন এক কোয়ান্টাম জগতের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।

মহাজাগতিক মঞ্চ

শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা একটু দার্শনিক হয়ে গেল। আমরা ভাবি আমরা কঠিন এক বাস্তব জগতে বাস করি। কিন্তু সত্যি বলতে, আমরা বাস করছি শক্তির উঠানামার ওপর দাঁড়ানো এক মহাজাগতিক মঞ্চে। যেখানে পরমাণুর শূন্যস্থান জুড়ে সবকিছুই কাঁপছে, বদলাচ্ছে, আর অদৃশ্য এক ছন্দে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। আর এটাই হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।