এআই কি ধ্বংস ডেকে আনবে?
এআই কি ধ্বংস ডেকে আনবে? এতদিন কথাটা সায়েন্স ফিকশনের মতো শোনাত। এআই একদিন মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হয়ে যাবে, চলে যেতে পারে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং হয়ে উঠতে পারে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি। এবার কথাগুলো বলছেন স্বয়ং এআই নিয়ে কাজ করা গবেষকরাই।
সম্প্রতি অ্যানথ্রপিক ছেড়েছেন এআই গবেষক জেকব কক্সন। এর আগে তিনি ওপেনএআইতেও কাজ করেছেন। তাঁর আশঙ্কাটা বেশ গুরুতর। এআই যে গতিতে শক্তিশালী হচ্ছে, নিরাপত্তার গবেষণা সেই গতিতে এগোচ্ছে না। কক্সনের অভিযোগ, আমরা যেন মানুষের জীবনকে বাজি রেখে ‘সেলফ-ইমপ্রুভিং সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরির দিকে ছুটছি। অর্থাৎ এমন এক অতি বুদ্ধিমান এআই, যেটা আরও উন্নত এআই তৈরিতে সাহায্য করতে পারবে।
আরও বড় সতর্কবার্তা
কক্সনের চেয়েও কড়া কথা বলেছেন অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট গবেষক ইভান হুবিঙ্গার। তিনি সরাসরি বলেছেন, “আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি, এআই মানুষকে হত্যা করতে পারে।”
তার আরও চমকে দেওয়ার মতো কথা আছে। তিনি বলেছেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে এআই মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। এমন ঝুঁকি তিনি ১০ শতাংশের বেশি বলে মনে করেন। তবে এই সংখ্যাটি কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল নয়। এটি তাঁর ব্যক্তিগত রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট।
কিন্তু তাঁর পরের কথাটাই আরো মারাত্মক। তিনি বলছেন, অ্যানথ্রপিক নিরাপদ এআই তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু ভবিষ্যতের অতি বুদ্ধিমান এআইকে কীভাবে নিশ্চিতভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, তার সমাধান এখনো তাদের জানা নেই।
ভয়টা আসলে কোথায়?
আজকের চ্যাটবট হঠাৎ জেগে উঠে মানুষকে আক্রমণ করবে- ভয়টা ঠিক সেখানে নয়। আসল চিন্তা ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ নিয়ে। নামটা কঠিন মনে হলেও ব্যাপারটা বোঝা সহজ।
মনে করুন, একদিন এআই নতুন এআই তৈরিতে মানুষের চেয়ে দক্ষ হয়ে গেল। সে আরও ভালো একটি এআই তৈরিতে সাহায্য করল। নতুন এআইটি আবার তার চেয়েও ভালো আরেকটি এআই তৈরিতে সাহায্য করল। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এই উন্নতির গতি মানুষের গবেষণার গতিকে অনেক পেছনে ফেলে দিতে পারে। তবে এমনটা ঘটবেই, তার কোনো সরাসরি প্রমাণ নেই। কিন্তু এআই নিরাপত্তা গবেষকদের বড় চিন্তার জায়গাটা এখানেই।
অস্বস্তিকর পরীক্ষা
তবে অ্যানথ্রপিকের নিজেদের কিছু পরীক্ষায় এআই মডেলের অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখা গেছে। বিশেষভাবে তৈরি একটি পরীক্ষায় এআই মডেল স্যান্ডবক্স থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছে। সিক্রেট অ্যাক্সেস কোড সংগ্রহ করেছে। এমনকি কম্পিউটার সিস্টেমে অনুমতি ছাড়া ঢোকার চেষ্টাও করেছে।
এর মানে কিন্তু এআই বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে – এমন নয়। এগুলো ছিল নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার পরিবেশ। তারপরও এই ফলগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শক্তিশালী এআই সব সময় ঠিক আমাদের ইচ্ছামতো আচরণ করবে- এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।
আসল প্রশ্ন ও আমাদের প্রস্তুতি
মানুষ এর আগেও ভয়ংকর শক্তিশালী প্রযুক্তি বানিয়েছে। পারমাণবিক বোমার কথাই ধরুন। কিন্তু এখানে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। পারমাণবিক বোমা নিজে বসে তার চেয়েও শক্তিশালী আরেকটি বোমার নকশা করতে পারে না। কিন্তু ভবিষ্যতের অতি বুদ্ধিমান এআই হয়তো তার চেয়েও বুদ্ধিমান এআই তৈরি করতে পারবে।
কক্সন বা হুবিঙ্গারের আশঙ্কা সত্যি হবেই, এমন কথা বলার সময় এখনো আসেনি। আবার সায়েন্স ফিকশন বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। বরং আমাদের এখনই প্রশ্ন করা দরকার – এআই যত দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, তাকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা কি একই গতিতে বাড়ছে? কারণ আমরা এমন এক কৃত্রিম অতিবুদ্ধিমত্তা তৈরির দিকে এগোচ্ছি, যাকে বানানোর কৌশল শিখে ফেলেছি কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল এখনো পুরোপুরি শিখিনি। আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটাও জরুরি।
