মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানওলবার্স প্যারাডক্স: রাতের আকাশ কেন অন্ধকার?

ওলবার্স প্যারাডক্স: রাতের আকাশ কেন অন্ধকার?

২৬ এপ্রিল, ২০১৮

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৩৫২ 💬 ০
ওলবার্স প্যারাডক্স: রাতের আকাশ কেন অন্ধকার?

বিজ্ঞানীদের অদ্ভুত প্রশ্ন ও নিউটন

বিজ্ঞানীরা সবসময় অদ্ভুত প্রশ্ন করতে ভালোবাসেন। আর এসব অদ্ভুত প্রশ্ন থেকেই তাঁরা প্রকৃতির রহস্যভেদ করতে চান। তাই আপেল গাছের নিচে বসে নিউটনের মনে হয়েছিলো, আপেলটা গাছ থেকে নিচে পড়লো কেন?

এই প্রশ্নটা নিউটনের আগে কারো মাথায় আসেনি। সবাই ভেবেছে আপেল তো নিচেই পড়বে, আপেল কি পাখি যে উড়ে যাবে? আপেলের কি ডানা আছে? এ নিয়ে তাই কেউ কোন প্রশ্ন করেনি। কিন্তু নিউটন সেভাবে ভাবেননি। তিনি ভেবেছিলেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আপেলটিকে নিচের দিকে টানছে।

তারপর তিনি আবিষ্কার করলেন, সব বস্তুই পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। যে বস্তুর ভর যত বেশি তার আকর্ষণের ক্ষমতাও তত বেশি। আমাদের পায়ের নিচের পৃথিবীটার ভর যেহেতু খুব বেশি, সেজন্য তার আকর্ষণের ক্ষমতাও খুবই বেশি। সেটাকে উপেক্ষা করা ক্ষুদ্র আপেলের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই বেচারাকে মাটিতেই পড়তে হয়েছে। সেটাকে তিনি বললেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। এভাবেই সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে অনেক বড় বড় আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা।

ওলবার্স প্যারাডক্স কী?

ঊনবিংশ শতাব্দীতে একজন জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, নাম তাঁর হেনরিক উইলহেল্ম ওলবার্স (১৭৫৮-১৮৪০), একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলেন—রাতের আকাশ কালো কেন? সাধারণ মানুষ বলবে, এতো সহজ প্রশ্ন, রাতের আকাশে সূর্য থাকে না, তাই রাতের আকাশ অন্ধকার দেখায়‌।

কিন্তু আগেই বলেছি বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির রহস্য ভেদ করতে চান। সাধারণের দৃষ্টি যেখানে শেষ হয়ে যায়, বিজ্ঞানীরা সেখান থেকেই তাঁদের দেখা শুরু করেন। ওলবার্স বললেন, ঠিক আছে বুঝলাম রাতে সূর্য থাকে না, কিন্তু অসংখ্য নক্ষত্র তো থাকে। এরা একেকটি সূর্যের মতোই গনগনে আগুনের পিন্ড, আলোর উৎস।

যদিও তাদের অবস্থান অনেক দূরে, কিন্তু কোটি কোটি নক্ষত্রের সম্মিলিত আলোর ছটায় রাতের আকাশ তো আলোকিত হয়ে উঠার কথা, কিন্তু সেটি হচ্ছে না কেন? জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই প্রশ্নটিকে বলা হয়, ওলবার্স প্যারাডক্স

ভুল ধারণা ও ধূলিকণা তত্ত্ব

বিজ্ঞানীরা গত দুইশ বছরে নানা ভাবে এই প্রশ্নটার উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন। প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন মহাশূন্যে প্রচুর ধূলিকণা আছে, তার কারণে বিভিন্ন নক্ষত্র থেকে আসা আলোকরশ্মি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যাটা অনেক বিজ্ঞানী মানলেন না। তাঁরা যুক্তি দিলেন, যদি তাই হতো, তাহলে ধূলিকণাগুলো সেই আলো শোষণ করে উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল হয়ে নিজেরাই আলো বিকিরণ করতো। কিন্তু বাস্তবে সেটি তো হচ্ছে না।

আরেক দল বিজ্ঞানী ব্যাখ্যা দিলেন অন্যভাবে। তাঁরা বললেন, দ্রুত অপসৃয়মান নক্ষত্রগুলোর রেডশিফ্টের (red shift) কারণে দৃশ্যমান আলো অদৃশ্য ইনফ্রারেড আলোতে পরিণত হচ্ছে। সেজন্য সেগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অন্যরা বললেন, তাহলে তো একই প্রক্রিয়াতে আলট্রা ভায়োলেট আলোও দৃশ্যমান আলোতে রূপান্তরিত হতো, সেটিও তো হচ্ছে না। ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ওলবার্স প্যারাডক্সের কোনো সুরাহা হলো না।

বিগ ব্যাং ও গ্রহণযোগ্য সমাধান

বিংশ শতাব্দীতে যখন বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব আবিষ্কৃত হলো, তখন বিজ্ঞানীরা এই ধাঁধাটির একটি গ্রহণযোগ্য উত্তর পেলেন। তাঁরা বললেন, মহাবিশ্বকে কার্যত অসীম মনে হলেও আসলে মহাবিশ্বের একটি সীমারেখা রয়েছে। তার কারণ হলো মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সময়ে এক মহাবিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো।

তাঁদের ধারণা, এই বিস্ফোরণটি ঘটেছিলো এখন থেকে ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন বছর আগে। সুতরাং সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকে পৃথিবীতে আলো আসা সম্ভব। এর বাইরের বা দূরের আলো এখনো আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্রের আলো হয়তো এখনো এসে পৌঁছেনি আমাদের পৃথিবীতে।

নক্ষত্রের জীবনকাল ও উপসংহার

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানীরা দেখলেন নক্ষত্রগুলোর একটি নির্দিষ্ট জীবনকাল রয়েছে। কোনো নক্ষত্র অনন্তকাল ধরে প্রজ্জ্বলিত থাকে না। তাদের জ্বালানি একসময় ফুরিয়ে যায়।

তার মানে হলো, যেকোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক নক্ষত্রের আলোই এসে পৃথিবীতে পৌঁছায়, এই সংখ্যাটি অসীম নয়। খালি চোখে পাঁচ হাজারের বেশি নক্ষত্র দেখা যায় না। রাতের আকাশকে দিনের মত আলোকিত করতে এই সংখ্যাটি যথেষ্ট নয়। এটাই হচ্ছে ওলবার্স প্যারাডক্স-এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *