মূল কন্টেন্টে যান
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › পদার্থ বিজ্ঞান › পারদ থেকে সোনা: নিউক্লিয়ার ফিউশনে সত্যি…

পারদ থেকে সোনা: নিউক্লিয়ার ফিউশনে সত্যি কি সম্ভব?

২৭ অক্টোবর, ২০২৬

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ০ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
পারদ থেকে সোনা: নিউক্লিয়ার ফিউশনে সত্যি কি সম্ভব?

পারদ থেকে সোনা! হাজার বছর ধরে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে সাধারণ ধাতুকে সোনায় পরিণত করার। মধ্যযুগের আলকেমিস্টরা সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য কত রকম পরীক্ষাই না করেছেন! কিন্তু সফল হননি।

এবার সেই প্রাচীন স্বপ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে আমেরিকার একটি স্টার্টআপ কোম্পানি। নাম ম্যারাথন ফিউশন (Marathon Fusion)। কোম্পানিটির দাবি, তারা নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তির সাহায্যে পারদ থেকে সোনা তৈরি করতে পেরেছে!

কিন্তু পারদ থেকে সোনা তৈরি হয় কীভাবে? আর কোম্পানিটির দাবি কতটা সত্য?

সোনা তৈরির রহস্য

পারদ আর সোনা দুটি আলাদা মৌল। তবে পরমাণুর গঠনের দিক থেকে এরা বেশ কাছাকাছি।

পারদের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে রয়েছে ৮০টি প্রোটন, আর সোনার নিউক্লিয়াসে ৭৯টি। অর্থাৎ পারদের নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা একটি কমাতে পারলেই সেটি সোনায় পরিণত হতে পারে।

কিন্তু সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এটি সম্ভব নয়। এজন্য পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠন বদলাতে হয়। এই প্রক্রিয়ার নাম নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন (Nuclear Transmutation)।

ম্যারাথন ফিউশনের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে তৈরি উচ্চশক্তির একটি নিউট্রন পারদ-১৯৮-এর নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করে। এতে সাময়িকভাবে পারদ-১৯৯-এর একটি অস্থায়ী নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। এরপর সেখান থেকে দুটি নিউট্রন বেরিয়ে গেলে সেটি হয়ে যায় পারদ-১৯৭।

এই পারদ-১৯৭ একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে সোনা-১৯৭-এ পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় নিউক্লিয়াসের একটি প্রোটন নিউট্রনে রূপান্তরিত হয়। ফলে পারদ হয়ে যায় সোনা!

আর সোনা-১৯৭ হলো সোনার একমাত্র স্থিতিশীল আইসোটোপ।

সোনা তৈরির ইতিহাস

পারমাণবিক বিক্রিয়ায় সোনা তৈরির ঘটনা কিন্তু নতুন নয়।

১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স বার্কলে গবেষণাগারে বিসমাথ থেকে অতি সামান্য পরিমাণ সোনা তৈরি করা হয়েছিল।

আর ২০২৫ সালে ইউরোপের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্ন (CERN) জানায়, তাদের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে সিসার নিউক্লিয়াস থেকে সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি হয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের পরীক্ষায় সেখানে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে সোনার পরিমাণ ছিল মাত্র ২৯ পিকোগ্রাম! সেই নিউক্লিয়াসগুলোও ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী।

অর্থাৎ পারমাণবিক বিক্রিয়ায় এক মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তর করা সম্ভব, এটি আগেই পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে।

ম্যারাথন ফিউশনের দাবি

ম্যারাথন ফিউশনের দাবি, তাদের পদ্ধতিতে আগের পরীক্ষাগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকরভাবে স্থিতিশীল সোনা উৎপাদন সম্ভব।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কোম্পানিটি হিসেব করে দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে একটি বড় ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে প্রায় দুই টন সোনা উৎপাদন করা যেতে পারে!

অর্থাৎ একই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সোনাও তৈরি হতে পারে।

তবে দুই টন সোনা উৎপাদনের হিসাবটি এখনো তাত্ত্বিক পূর্বাভাস। বাস্তবে এত সোনা তৈরি করার পদ্ধতি এখন আবিষ্কৃত হয়নি।

প্রমাণ কতটুকু?

এখানেই দাবি আর প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্যের মধ্যে পার্থক্য।

পারমাণবিক বিক্রিয়ায় সোনা তৈরি সম্ভব, এটি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ম্যারাথন ফিউশনের সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল এখনো স্বাধীন গবেষণাগারে যাচাই করা হয়নি।

কোম্পানিটি ঠিক কতটুকু সোনা তৈরি করেছে, সেই সোনার বিশুদ্ধতা কত, উৎপাদনে কত শক্তি ও অর্থ ব্যয় হয়েছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

তাছাড়া পারমাণবিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন সোনার মধ্যে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে উৎপাদিত সোনা নিরাপদে ব্যবহারের আগে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন হতে পারে।

তাই এই প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উপায়ে সোনা উৎপাদন সম্ভব হবে কি না, সেটা এখনো অনিশ্চিত।

আলকেমি থেকে বিজ্ঞান

মধ্যযুগের আলকেমিস্টরা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণ ধাতুকে সোনায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না, একটি মৌলের পরিচয় নির্ধারণ করে তার নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটনের সংখ্যা।

আজ আমরা জানি, সেই সংখ্যা বদলাতে পারলেই একটি মৌল অন্য মৌলে পরিণত হয়।

আধুনিক পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান সেই রূপান্তরকে বাস্তবে সম্ভব করে দেখিয়েছে।

তবে পারদ থেকে সোনা পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা আর লাভজনকভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সোনা উৎপাদন করা এক কথা নয়। প্রথমটি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য, দ্বিতীয়টি এখনো গবেষণার বিষয়।

তবে কে জানে, ভবিষ্যতে একদিন হয়তো সোনার খনির পাশাপাশি গড়ে উঠবে সোনা তৈরির কারখানাও!

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।