মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানমহাবিশ্বের দূরত্ব পরিমাপ: নক্ষত্র থেকে গ্যালাক্সির…

মহাবিশ্বের দূরত্ব পরিমাপ: নক্ষত্র থেকে গ্যালাক্সির দূরত্ব মাপার ইতিহাস

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১১১ 💬 ০
মহাবিশ্বের দূরত্ব পরিমাপ: নক্ষত্র থেকে গ্যালাক্সির দূরত্ব মাপার ইতিহাস

আকাশের সীমানা ও মানুষের কৌতূহল

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়েছে। কিন্তু তারা কত দূরে, এই প্রশ্নের উত্তর দীর্ঘদিন ছিল কেবল কল্পনার মধ্যে। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টার্কাস কিংবা হিপারকাস আকাশের দূরত্ব নিয়ে কিছু কিছু অনুমান করেছিলেন, কিন্তু তখনকার দিনে না ছিল দূরবীন, না ছিল সূক্ষ্ম যন্ত্র। তাদের মাপ ছিল কেবল ধারণাভিত্তিক। রেনেসাঁ যুগে গ্যালিলিও দূরবীন বানিয়ে তারাদের আরও স্পষ্ট করে দেখলেন, তবুও তাদের দূরত্ব রয়ে গেল রহস্যময়।

প্রথম সাফল্য: প্যারাল্যাক্স পদ্ধতি

অবশেষে উনিশ শতকের শুরুতে এলো প্রথম সাফল্য। ১৮৩৮ সালে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিডরিখ বেসেল প্রথমবারের মতো একটি নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ভুলভাবে মাপতে সক্ষম হন।

পৃথিবী বছরে একবার সূর্যের চারপাশে ঘোরে। জানুয়ারি ও জুলাই মাসে পৃথিবী সূর্যের বিপরীত প্রান্তে অবস্থান করে। তখন আমাদের কাছের কোনো তারাকে দূরের তারাদের তুলনায় সামান্য সরে গেছে বলে মনে হয়। এই ক্ষুদ্র সরে যাওয়াকে বলে প্যারাল্যাক্স। বেসেল সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে সেই কোণ মেপে দেখালেন, 61 Cygni নামের তারাটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১১ আলোকবর্ষ দূরে। মানব ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথমবার কোনো নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ভুলভাবে মাপা।

হেনরিয়েটা লিভিট ও সেফেইড ভেরিয়েবল

তবে এই পদ্ধতি কয়েক হাজার আলোকবর্ষের বেশি দূরে কার্যকর হয় না। আরও দূরের নক্ষত্রের জন্য দরকার নতুন কৌশল। তখন আবির্ভূত হলেন হার্ভার্ড অবজারভেটরির প্রতিভাময়ী জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরিয়েটা লিভিট। বিশ শতকের শুরুতে তিনি “সেফেইড ভেরিয়েবল” নক্ষত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক বিস্ময়কর সূত্র আবিষ্কার করেন। তিনি দেখলেন, এ ধরনের তারাদের আলো বাড়া-কমার সময়কাল যত দীর্ঘ, তাদের প্রকৃত উজ্জ্বলতাও তত বেশি।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১০০ ওয়াটের বাল্বকে কাছে রাখলে খুব উজ্জ্বল লাগে, দূরে সরালে ম্লান লাগে। কিন্তু বাল্বের আসল ক্ষমতা (১০০ ওয়াট) বদলায় না। লিভিটের সূত্রও তেমন। এটি বলে দেয়, কোনো সেফেইড তারার প্রকৃত শক্তি কতটা। একবার সেই আসল উজ্জ্বলতা জানা গেলে, পৃথিবী থেকে দেখা উজ্জ্বলতার সঙ্গে তুলনা করলেই বেরিয়ে আসে তার দূরত্ব।

এডউইন হাবল ও গ্যালাক্সির জগত

১৯২৪ সালে এই সূত্র কাজে লাগালেন কিংবদন্তির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে বসে অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথে সেফেইড ভ্যারিয়েবল তারা খুঁজে পেলেন।

এদের দূরত্ব মেপে তখন তিনি বুঝতে পারলেন, অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের মিল্কিওয়ের অংশ নয়; এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি গ্যালাক্সি, এর অবস্থান প্রায় ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। এই আবিষ্কার মানুষকে প্রথম দেখিয়েছিল, মহাবিশ্ব মানে শুধু আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি নয়, বরং অসংখ্য গ্যালাক্সির বিশাল সমাহার।

সুপারনোভা ও কসমিক বাতিঘর

এরপর আবিষ্কৃত হলো Type Ia Supernova (টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা)। এক ধরনের তারার বিস্ফোরণ, যার উজ্জ্বলতা সর্বত্র প্রায় একই রকম থাকে। তাই দূরবর্তী গ্যালাক্সিতে যখন এই বিস্ফোরণ ঘটে, সেটি হয়ে ওঠে এক মহাজাগতিক বাতিঘর বা “স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল”। এসব সুপারনোভার আলো মেপে গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ভুলভাবে জানা যায়।

রেডশিফট ও প্রসারিত মহাবিশ্ব

কিন্তু সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় আরেকটি পদ্ধতি, এর নাম, রেডশিফট। মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে, তাই যত দূরের গ্যালাক্সি, তার আলো তত লালচে হয়ে আসে। আলো কতটা লাল হয়েছে তা মেপে নির্ণয় করা যায় সেই গ্যালাক্সির দূরত্ব কত।

এখানে কাজে লাগে হাবলের সূত্র। এই সূত্র বলে, কোন গ্যালাক্সি যত দ্রুত সরে যাচ্ছে, সেটি তত দূরে অবস্থান করছে। এই সূত্র ব্যবহার করেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সির অবস্থান নির্ণয় করেছেন।

কসমিক ডিস্ট্যান্স ল্যাডার

এই ধাপে ধাপে দূরত্ব মাপার কৌশলকে বলা হয় কসমিক ডিস্ট্যান্স ল্যাডার। ১. প্রথম ধাপে প্যারাল্যাক্স। ২. পরের ধাপে সেফেইড তারা। ৩. তারপরে সুপারনোভা। ৪. আর সবচেয়ে দূরে রেডশিফট।

এক ধাপ আরেক ধাপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সিঁড়ি বেয়ে মানুষ শিখেছে কাছ থেকে দূরে, আর দূর থেকে আরও দূরে মহাবিশ্বকে মাপতে।

উপসংহার

আজ আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি প্রায় ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে, আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্র প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে, আর কিছু গ্যালাক্সি রয়েছে শত শত কোটি আলোকবর্ষ দূরে।

এগুলো নিছক কোনো অনুমান নয়। এর পেছনে আছে শতাব্দী জুড়ে মানুষের নিরলস পর্যবেক্ষণ, সূক্ষ্ম গণনা আর অদম্য কৌতূহল। তাই যখন শুনবেন কোনো তারা দশ আলোকবর্ষ দূরে বা কোনো গ্যালাক্সি কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, তখন মনে রাখবেন, এই সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক দীর্ঘ যাত্রা। আর সেই যাত্রার প্রতিটি ধাপ মানব সভ্যতার একেকটি বিজয়ের গল্প।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *