মূল কন্টেন্টে যান
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতাবিবিধ বিজ্ঞানগ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫: বাংলাদেশের অবস্থান…

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫: বাংলাদেশের অবস্থান ও গবেষণার সংকট

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১১২ 💬 ০
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫: বাংলাদেশের অবস্থান ও গবেষণার সংকট

বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান

গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫ প্রকাশিত হয়েছে। এই সুচকের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কোথায় অবস্থান করছে তার একটা তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়।

এই সূচকে দেখা যাচ্ছে, ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম স্থানে। বাংলাদেশের এই অবস্থান আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশ কেনিয়া কিংবা ঘানারও পেছনে। গত বছরের স্থান অপরিবর্তিত থাকলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট। ২০২২ সালে একসময় বাংলাদেশ ১০২তম স্থানে উঠেছিল, কিন্তু টেকসই গবেষণা ও উদ্ভাবনের ভিত্তি না থাকায় আবার পিছিয়ে গেছে।

গবেষণায় অনীহা ও কাঠামোগত দুর্বলতা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো মানবসম্পদ ও গবেষণার অবস্থা। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম, কার্যত তলানির কাছাকাছি। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

  • উচ্চশিক্ষার মান: বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক গবেষণা প্রায় নেই বললেই চলে।
  • বিনিয়োগ সল্পতা: গবেষণায় বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ০.৩৩ শতাংশেরও কম।
  • আউটপুট: গবেষকপ্রতি প্রকাশনা, পেটেন্ট বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গড় মানের নিচে।

বিশ্বজুড়ে যেখানে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা দ্রুত এগোচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ আটকে আছে ভোগবাদী ও আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে।

শিল্প ও বাণিজ্যে স্থবিরতা

শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ‘বিজনেস সোফিস্টিকেশন’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম। বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি হলেও স্থানীয় উদ্ভাবন সীমিত। দেশীয় শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। তথ্যপ্রযুক্তি খাত কিছুটা এগোলেও তা মূলত আউটসোর্সিং নির্ভর, মৌলিক প্রযুক্তি সৃষ্টিতে অবদান সীমিত।

এ অবস্থাকে আরও জটিল করেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। নীতি কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। দুর্বল প্রশাসন, নীতি বাস্তবায়নে গাফিলতি, এবং স্বচ্ছতার অভাব গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথে প্রধান বাধা। অনেক সময় গবেষণা বরাদ্দ রাজনৈতিক বিবেচনায় বণ্টিত হয়, ফলে প্রকৃত গবেষকরা সুযোগ পান না।

সম্ভাবনার আলো ও তরুণ প্রজন্ম

তবে সামান্য কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। অবকাঠামো খাতে ৯০তম এবং সৃজনশীল আউটপুটে ৮৬তম স্থানে বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো করেছে। এর কৃতিত্ব মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারকারী তরুণ প্রজন্ম ও সৃজনশীল শিল্পের উদ্যোক্তাদের। কিন্তু এগুলো জাতীয়ভাবে বিজ্ঞান গবেষণায় রূপান্তর ঘটানোর মতো পর্যাপ্ত নয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ কেবল নেপালের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছে।

বিশ্বের শীর্ষ দেশ ও শিক্ষার

বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর দিকে তাকালে ব্যবধান আরও প্রকট হয়। শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে: ১. সুইজারল্যান্ড ২. সুইডেন ৩. যুক্তরাষ্ট্র ৪. দক্ষিণ কোরিয়া ৫. সিঙ্গাপুর ৬. যুক্তরাজ্য ৭. ফিনল্যান্ড ৮. নেদারল্যান্ডস ৯. ডেনমার্ক ১০. চীন

তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, উদ্ভাবনবান্ধব নীতি ও গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ। চীন মাত্র এক প্রজন্মে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মহাশক্তি হয়ে উঠেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ এখনও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ব্যর্থ, গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে অক্ষম এবং শিল্প-বাণিজ্যে বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে অপারগ।

উত্তরণের পথ ও উপসংহার

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্থবির অবস্থান কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে, শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন না ঘটালে এবং গবেষকদের জন্য টেকসই পরিবেশ না গড়লে বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও কেবল ভোক্তা অর্থনীতিই হয়ে থাকবে।

তবুও আশার আলো আছে। দেশে এক বিপুল তরুণ ও উদ্ভাবনী জনগোষ্ঠী রয়েছে। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা মেলে, তবে এই শক্তিই বাংলাদেশকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে পারবে। উন্নয়নশীল দেশের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে উদ্ভাবনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে বিজ্ঞান ও গবেষণাকেই জাতীয় অগ্রাধিকারের শীর্ষে তুলতে হবে। এ ছাড়া আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *