মূল কন্টেন্টে যান
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সৌরজগৎ English

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতা › পদার্থ বিজ্ঞান › সময়ের স্রোত

সময়ের স্রোত

১৪ অক্টোবর, ২০২৬

⏱ ৪ মিনিট পড়ার সময়

👁 ৪ 💬 ০
শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স
সময়ের স্রোত

অতীত কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? ভবিষ্যৎ কি এখনো তৈরি হয়নি? নাকি মহাবিশ্বে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সবই একসঙ্গে রয়েছে?

প্রশ্নগুলো শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলছে, সময়ের স্রোত সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা পুরোপুরি সঠিক নাও হতে পারে।

চারমাত্রিক মহাবিশ্ব

আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন, স্থান আর সময় আলাদা কিছু নয়। ত্রিমাত্রিক স্থান আর একমাত্রিক সময় একসাথে মিলেই তৈরি করেছে চারমাত্রিক স্পেসটাইম। এখান থেকে এসেছে এক বিস্ময়কর ধারণা। যার নাম, ব্লক ইউনিভার্স।

সহজভাবে বললে, মহাবিশ্ব যেন একটি চলমান সিনেমা। আমরা পর্দায় একটির পর একটি দৃশ্য দেখি। কিন্তু সিনেমার সব দৃশ্যই একটি ফাইলে সংরক্ষিত থাকে। ব্লক ইউনিভার্সের ধারণা অনুযায়ী, সময়ও অনেকটা এমন। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই মহাবিশ্বের চারমাত্রিক কাঠামোর অংশ। আমরা শুধু একটির পর একটি মুহূর্ত অনুভব করি। তবে এটি এখনো সময়ের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার একটি তাত্ত্বিক ধারণা। প্রমাণিত সত্য নয়।

কোয়ান্টাম রহস্য

২০২৩ সালে একদল গবেষক কোয়ান্টাম জগতের কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে একটি অভিনব গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁরা এমন একটি তাত্ত্বিক কাজ করেন, যেখানে মনে হতে পারে ভবিষ্যতের কোনো তথ্য অতীতের ঘটনাকে প্রভাবিত করছে।

বিষয়টি বুঝতে হলে কোয়ান্টাম জগতের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা দরকার। কোয়ান্টাম জগতে দুটি কণা এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে যে, একটির অবস্থা মাপলে অন্যটির অবস্থা সম্পর্কেও জানা যায়। এমনকি কণা দুটি অনেক দূরে থাকলেও এই সম্পর্ক বজায় থাকে। এই ঘটনাকে বলা হয়, কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট। আইনস্টাইন একে বলেছিলেন, “স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিসটেন্স”। অর্থাৎ দূর থেকে ভূতুড়ে কারবার।

গবেষকেরা এই কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে অতীতে তথ্য পাঠানোর মতো একটি বিস্ময়কর পরিস্থিতির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, বিশেষ কিছু কোয়ান্টাম কৌশল ব্যবহার করে এমন ফল পাওয়া সম্ভব, যেটা দেখে মনে হয় পরীক্ষার শেষে পাওয়া তথ্য শুরুতেই কাজে লাগানো হয়েছে।

এই পরীক্ষণ পদ্ধতিতে “ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ” বা সিটিসির (CTC) কিছু বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করা হয়েছে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে সিটিসি হলো স্থানকালের এমন একটি পথ, যেটা ঘুরে নিজের অতীতের কোনো ঘটনায় ফিরে আসে। অর্থাৎ, এমন পথে চললে নিজের অতীতে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

তবে এটা মনে রাখতে হবে, গবেষকেরা বাস্তবে এমন কোনো পথ তৈরি করেননি বা কোনো তথ্য অতীতে পাঠাননি। তাঁরা শুধু গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন, কোয়ান্টাম কণার বিশেষ সম্পর্ক এবং ফলাফল বাছাইয়ের কৌশল ব্যবহার করে অতীতে তথ্য পাঠানোর মতো আচরণ অনুকরণ করা যায়।

অতীতের ধাঁধা

সময়ভ্রমণ নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অতীত বদলে ফেলার সম্ভাবনা। ধরুন, কেউ অতীতে ফিরে গিয়ে এমন কিছু করলেন, যার ফলে তাঁর নিজের জন্মই হলো না। তাহলে তিনি অতীতে ফিরে গেলেন কীভাবে? এটিই বিখ্যাত “গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স” নামে পরিচিত।

কিছু তাত্ত্বিক মডেল বলছে, সময়ভ্রমণ সম্ভব হলেও অতীতে এমন কিছু ঘটানো যাবে না, যেটা তার নিজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অর্থাৎ ঘটনাগুলো এমনভাবে ঘটতে হবে, যাতে কোনো পারস্পরিক বিরোধ তৈরি না হয়। তবে বাস্তবে অতীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব, এমন কোনো প্রমাণ বিজ্ঞানীরা পাননি।

সময়ের অস্তিত্ব

ব্লক ইউনিভার্সের ধারণা সত্যি হলে সময় সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে যাবে। তখন অতীত মানে হারিয়ে যাওয়া কিছু নয়। ভবিষ্যৎও হয়তো এমন কিছু নয়, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। মহাবিশ্বের সব মুহূর্তই একটি বিশাল চারমাত্রিক কাঠামোর অংশ হতে পারে।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এই আলোচনাকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। কারণ তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সর্বত্র সবার জন্য “একই সময়” বলে কিছু নেই। সময় আপেক্ষিক। একজনের কাছে একটি দূরবর্তী ঘটনা একই সময়ে ঘটলেও অন্য একজন চলমান পর্যবেক্ষকের কাছে সেটা একই সময়ের ঘটনা নাও হতে পারে।

তবে ব্লক ইউনিভার্সের ধারণা সত্যি হলেই আমাদের জীবনের প্রতিটি ঘটনা কি আগে থেকে নির্ধারিত, সেটি কিন্তু আলাদা প্রশ্ন।

সময়ের তীর

সময়কে আমরা একদিকে চলতে দেখি। সময় চলে অতীত থেকে বর্তমানের ভেতর দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে। একে বলে, অ্যারো অফ টাইম।

শিশুরা বড় হয়, বাল্যকাল কখনো আর ফিরে আসে না। ফুল ফোটে, তারপর ঝরে যায়। ঝরা ফুল আবার ফোটে না। ভাঙা গ্লাস নিজে থেকে জোড়া লাগে না। প্রকৃতিতে সময়ের এই একমুখী আচরণের সঙ্গে এনট্রপি বৃদ্ধির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সহজভাবে বললে, এনট্রপি হলো কোনো ব্যবস্থায় শক্তি কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, তার একটি পরিমাপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তি ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। এই পরিবর্তনই আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, সময় কেন অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়, উল্টো দিকে নয়।

কিন্তু আমরা কেন শুধু বর্তমানকে অনুভব করি? কেন অতীত মনে রাখতে পারি, অথচ ভবিষ্যৎকে অনুভব করতে পারি না? এসব প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের জানা নেই।

অনন্ত প্রশ্ন

কোয়ান্টাম গবেষণা সময় সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এই গবেষণা সময়ভ্রমণ কিংবা ব্লক ইউনিভার্সের সত্যতা প্রমাণ করেনি।

হয়তো সময় সত্যিই বয়ে চলে। আবার হয়তো অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই মহাবিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা শুধু একটির পর একটি মুহূর্ত অনুভব করি। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়, সময়ের স্রোত কি সত্যি এগিয়ে চলেছে, নাকি আমরাই সময়ের ভেতর দিয়ে ভেসে চলেছি?

শেয়ার ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম এক্স

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।