মূল কন্টেন্টে যান
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প – এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি, ‘বিচিত্র বিজ্ঞান’ নামের এই ওয়েব সাইট।

প্রথম পাতামহাকাশ বিজ্ঞানসাধারণ আপেক্ষিকতা: সূর্যগ্রহণ থেকে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং

সাধারণ আপেক্ষিকতা: সূর্যগ্রহণ থেকে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

⏱ ৩ মিনিট পড়ার সময়

👁 ১০৭ 💬 ০
সাধারণ আপেক্ষিকতা: সূর্যগ্রহণ থেকে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং

স্থান-কালের বক্রতা ও মহাকর্ষ

১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলেছিলেন, বস্তুর ভরের কারণে স্থান-কালের বুননে এক ধরনের বক্রতার সৃষ্টি হয়। যে বস্তুর ভর যত বেশি হবে, তার চারপাশে স্থান-কালের মধ্যে বক্রতার পরিমাণও হবে তত বেশি। এই বক্রতাকেই আমরা মহাকর্ষ বল হিসেবে দেখি।

সপ্তদশ শতাব্দীতে স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ বলের যে চিরায়ত ধারণা দিয়েছিলেন সেটা নিয়ে এর আগে কেউ প্রশ্ন তুলেনি। কিন্তু আইনস্টাইন মহাকর্ষ নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কথা শোনালেন। তাঁর মতে মহাকর্ষ আসলে স্থান-কালের চাদরে বক্রতারই বহিঃপ্রকাশ। এটা একটি জ্যামিতিক ব্যাপার। বলাই বাহুল্য, আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব ছিল যুগান্তকারী এবং চাঞ্চল্যকর।

১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণ ও প্রমাণ

কিন্তু বিজ্ঞানে শুধু তত্ত্ব দিলেই চলবে না, চাই প্রমাণ। আর এই কাজটাই করেছিলেন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার আর্থার এডিংটন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রকাশের চার বছর পর, ১৯১৯ সালের ২৯ মে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে। সেই গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগই তিনি কাজে লাগালেন।

এই পরীক্ষার জন্য তিনি বেছে নিলেন সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করা একটি নক্ষত্রকে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ও ব্রাজিলের দুটি স্থান থেকে একযোগে নক্ষত্রটির ছবি তোলা হয়। সাধারণ দিনে সূর্যের আলোয় নক্ষত্রটি দেখা যেত না, কিন্তু গ্রহণের সময় তা দৃশ্যমান হলো।

নক্ষত্রটির আলোকরশ্মি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, এটি তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে প্রায় ১.৭৫ আর্ক সেকেন্ড সরে গেছে। এডিংটনের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হলো, সূর্যের ভরের কারণে তার চারপাশের স্থান-কাল বাঁকা হয়ে গেছে। আর সেই বাঁকা পথে চলতে গিয়ে আলোও দিক পরিবর্তন করেছে। আলোর এই সরে যাওয়ার পরিমাণ আইনস্টাইনের হিসেবের সঙ্গেই মিলে গেল। এটিই ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণ। এই সাফল্যের ফলে আইনস্টাইন রাতারাতি হয়ে উঠলেন বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা বিজ্ঞানী। পরবর্তীতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেও তাঁর তত্ত্ব আরো নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং: প্রকৃতির লেন্স

এরপর স্থান-কালের বক্রতার ধারণা থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে তৈরি হলো এক বিশেষ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি, যার নাম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মতো এই প্রাকৃতিক লেন্সও ক্ষীণ আলোকরশ্মিকে বাড়িয়ে তোলে, আর সেই আলোকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণে কাজে লাগান।

মনে করুন, একটি বিশাল গ্যালাক্টিক ক্লাস্টারের পেছনে লুকিয়ে আছে ছোট্ট এক দূরবর্তী গ্যালাক্সি। সামনের ক্লাস্টারের প্রবল মহাকর্ষীয় টানে দূরের গ্যালাক্সির আলো বাঁক খেয়ে পৃথিবীতে পৌঁছায়। ফলে মনে হয়, যেন একটির বদলে দুটি গ্যালাক্সি আছে ওখানে। এই কৌশল ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহু দূরবর্তী ক্ষীণ গ্যালাক্সিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন।

আইনস্টাইন রিং ও জেমস ওয়েব

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক সময় প্রবল গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের ফলে দূরের গ্যালাক্সির আলো রিংয়ের আকৃতিতে দেখা যায়। আইনস্টাইনের সম্মানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে বলেন, আইনস্টাইন রিং। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে এমন বেশ কিছু আইনস্টাইন রিং আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে একটি চমকপ্রদ রিং হলো GAL-CLUS-022058-38303।

ইদানীং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে দূরবর্তী গ্যালাক্সির ছবি তুলছে। সংক্ষেপে বলা যায়, গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স হলো প্রকৃতির এক অদৃশ্য ম্যাগনিফাইং লেন্স। এর প্রবল মহাকর্ষ বলের সাহায্যে জ্যোতির্বিদরা বহু ক্ষীণ ও দূরবর্তী গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছেন।

উপসংহার

মহাকর্ষের টানে আলো বেঁকে যাওয়ার এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়াই আজ আমাদের চোখে খুলে দিচ্ছে মহাবিশ্বের গোপন দরজা। এই প্রাকৃতিক লেন্সের সাহায্যে মানুষ শুধু দূরতম গ্যালাক্সিকেই আবিষ্কার করছে না, পাশাপাশি উন্মোচন করছে মহাবিশ্বের অদৃশ্য কাঠামো আর রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের গোপন আভাস। আর এর মূল কৃতিত্ব হলো মহাবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের, যার সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের ভিত্তিতেই গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের জন্ম হয়েছে।

Tanvir Hossain

bichitrobiggan.com

তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *