আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেই দৃশ্যমান জগতটা আসলে খুবই উপরের স্তর। টেবিল, চেয়ার, গাছ, মানুষ – সবকিছুর ভেতরে ঢুকে গেলে দেখা যাবে অণু, তার ভেতরে আছে পরমাণু, আর পরমাণুর গভীরে রয়েছে প্রোটন ও নিউট্রন। কিন্তু গল্পটা সেখানেও শেষ নয়। প্রোটনের আর নিউট্রনের ভেতরেও আছে আরও ছোট্ট এক জগত- কোয়ার্কের জগত। এদের ছয়টি ধরন আছে: আপ, ডাউন, চার্ম, স্ট্রেঞ্জ, টপ এবং বটম। কোয়ার্কের সেই অদৃশ্য জগত থেকেই এবার এলো নতুন এক চমক।
লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের বিস্ময়কর পরীক্ষা
ইউরোপের বিখ্যাত গবেষণাগার সার্ন (CERN)-এর, বিশাল এক যন্ত্রের ভেতরে চলছে এক অন্যরকম পরীক্ষা। এই যন্ত্রের নাম লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার, সংক্ষেপে এলএইচসি। নামটা শুনতে যতটা খটমটে, এর কাজকম্মটাও ততটাই বিস্ময়কর। এর ভেতরে প্রোটন কণাগুলোকে প্রায় আলোর গতিতে ছুটিয়ে এনে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এর ফলে মুহূর্তের জন্য সৃষ্টি হয় এক ক্ষুদ্র আদিম মহাবিশ্ব- অস্থির, উত্তপ্ত, আর অগণিত কণায় ভরা। সেই সংঘর্ষের ভেতর থেকেই বিজ্ঞানীরা এবার খুঁজে পেয়েছেন নতুন এক কণাকে।
ভারী চার্ম কোয়ার্ক ও ব্যারিয়ন কণার বৈশিষ্ট্য
প্রথম দেখায় এই কণাকে খুব একটা আলাদা কিছু মনে হয়নি। অনেকটা প্রোটনের মতোই তিনটি কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি, অর্থাৎ এটি একটি ব্যারিয়ন কণা। কিন্তু এর ভেতরের গল্পটা একেবারেই অন্যরকম। আমাদের পরিচিত প্রোটনের ভেতরে থাকে দুটি “আপ” কোয়ার্ক আর একটি “ডাউন” কোয়ার্ক – সবই তুলনামূলকভাবে হালকা। কিন্তু নতুন এই কণাটির ভেতরে রয়েছে দুটি ভারী “চার্ম” কোয়ার্ক এবং একটি “ডাউন” কোয়ার্ক। অর্থাৎ, এখানে যেন হালকা ইটের বদলে বসানো হয়েছে ভারী পাথর। আর সেই কারণে কণাটির ভরও বেড়ে গেছে নাটকীয়ভাবে – প্রোটনের প্রায় চার গুণ। এই ধরনের কণা খুব বেশি দেখা যায় না। কারণ ভারী কোয়ার্ক মানেই অস্থিরতা। এই কণাগুলো জন্ম নেয়, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে অন্য কণায়। এতটাই ক্ষণস্থায়ী যে সরাসরি “দেখা” প্রায় অসম্ভব।
বিজ্ঞানীদের কণা বিশ্লেষণের বিশেষ কৌশল
তাহলে বিজ্ঞানীরা জানলেন কীভাবে? এখানেই আসে বিজ্ঞানের এক চমৎকার কৌশল। সংঘর্ষের পরে যে কণাগুলো বেরিয়ে আসে, তাদের গতিপথ, শক্তি আর আচরণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝে নেন এর আগে সেখানে কী ছিল। অনেকটা ভাঙা কাঁচের টুকরো দেখে যেমন বোঝা যায় সেটা আগে কী ধরনের গ্লাস ছিল, ঠিক তেমনি। এই নতুন কণাটিও ধরা পড়েছে সেরকম ভাঙা টুকরোর মধ্যেই।আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই আবিষ্কারের নিশ্চিততা এতটাই বেশি যে এর পরিসংখ্যানিক মান দাঁড়িয়েছে “৭ সিগমা”। বিজ্ঞানের ভাষায়, ৫ সিগমা হলেই কোনো কিছু নিশ্চিত ধরা হয়। সেখানে ৭ সিগমা মানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে আমাদের কী লাভ হলো? এই ধরনের ভারী কোয়ার্কযুক্ত কণাগুলো আসলে বিজ্ঞানীদের জন্য একেকটা ক্ষুদ্র পরীক্ষাগার। এগুলোর ভেতর দিয়ে তারা বুঝতে পারেন প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী বল, স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স, কীভাবে কাজ করে। এই বলই কোয়ার্কগুলোকে বেঁধে রাখে, আর তার ফলেই তৈরি হয় প্রোটন, নিউট্রন অর্থাৎ আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান বস্তু।
কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্স ও মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ
এই গবেষণা আমাদের আরেক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্সের দিকে। এটা হচ্ছে সেই তত্ত্ব যেটা শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বলকে ব্যাখ্যা করে। সহজ করে বললে, ক্ষণিকের জন্য জন্ম নেওয়া এই অদ্ভুত কণাটি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে মহাবিশ্বের ভেতরের এক গভীর গোপন কথা। হয়তো আমরা তাকে সরাসরি দেখতে পাইনি। কিন্তু তার ক্ষণিকের অস্তিত্বই বলে দেয়, মহাবিশ্ব এখনো তার সব রহস্য উন্মোচন করেনি।
